Wednesday, 21 October 2026
শিরোনাম
ভারতের সবচেয়ে বড় ব্যাংকে সাইবার হামলা, প্রায় ৪ লাখ গ্রাহকের তথ্য চুরি ৭ নভেম্বর সাধারণ ছুটি ঘোষণা,প্রজ্ঞাপন জারি কুষ্টিয়ায় তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের চেষ্টার অভিযোগে মাদরাসা শিক্ষক কারাগারে হরমুজে ৩ তেলবাহী জাহাজে আগুন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রশ্ন ফাঁসের মামলায় যুবক গ্রেপ্তার পর্যাপ্ত আয়োডিনযুক্ত লবণ পাচ্ছে না ২৪ শতাংশ পরিবার ঠাকুরগাঁওয়ে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ বিষয়ক কর্মশালা ফের চালু হচ্ছে ডিভি লটারি, জেনে নিন আবেদনের সময় দুর্গাপূজা উপলক্ষে জামালপুরে যুবদল নেতার রাজুর বস্ত্র বিতরণ মেলান্দহে নাটমন্দির পরিদর্শনে এমপি বাবুল, সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ্বান
জাতীয়

পর্যাপ্ত আয়োডিনযুক্ত লবণ পাচ্ছে না ২৪ শতাংশ পরিবার

• • পঠিত 20 বার
শেয়ার করুন:
পর্যাপ্ত আয়োডিনযুক্ত লবণ পাচ্ছে না ২৪ শতাংশ পরিবার
ছবি সংগৃহিত

মানবদেহে থাইরয়েড হরমোন তৈরি এবং স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশের  জন্য আয়োডিন একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। শরীরে আয়োডিনের অভাবের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকিসহ দেখা দেয় নানা রোগ। 

 

এগুলো 'আয়োডিন ঘাটতিজনিত রোগ বলে পরিচিত। এরমধ্যে গলগণ্ড, হাইপোথাইরয়েডিজম, মানসিক প্রতিবন্ধকতা ও বুদ্ধিহীনতা, অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ঝুঁকি, বামনত্ব বা খাটো হওয়া,  শিশু কানে কম শোনা (বধিরতা), কথা বলায় সমস্যা কিংবা পেশির দুর্বলতা উল্লেখযোগ্য রোগ।  এসব রোগগ প্রতিরোধের উপায় হলো প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় সঠিক মাত্রা ১৫ পিপিএম আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার করা।

 

আজ বিশ্ব আয়োডিন অভাবজনিত রোগ প্রতিরোধ দিবস। ১৯৯০ সালের পর থেকে প্রতি বছর ২১ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। মানবদেহে আয়োডিনের প্রয়োজনীয়তা, থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্য রক্ষা এবং আয়োডিনের ঘাটতিজনিত বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি ও রোগ প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরি করতেই দিবসটি পালিত হয়। 

 

বাংলাদেশের পরিস্থিতি:

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও দেশে এখনও শতভাগ পরিবারের জন্য আয়োডিনযুক্ত লবণ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। সরকারের বিভিন্ন প্রচার-প্রচারণা ও আইন প্রয়োগের ফলে দেশের প্রায় ৭৬ শতাংশ পরিবার বর্তমানে আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার করছে। আয়োডিনের ঘাটতি পূরণে সার্বিক বিচারে এটি একটি সন্তোষজনক অবস্থান হলেও বৈশ্বিক আদর্শ লক্ষ্যমাত্রা ৯০ শতাংশ স্পর্শ করতে এখনও ১৪ শতাংশ বা পয়েন্ট পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। তবে এই ঘাটতি কবে নাগাদ পূরণ সম্ভব হবে, সে বিষয়ে সরকারের কাছে দৃশ্যমান কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেই।

 

জাতিসংঘের 'ইউনিভার্সাল সল্ট আয়োডাইজেশন' (ইউএসআই)-এর বৈশ্বিক লক্ষ্য হলো— যেকোনো দেশের অন্তত ৯০ শতাংশ পরিবারে ন্যূনতম ১৫ পিপিএম (পার্টস পার মিলিয়ন) মাত্রার আয়োডিনযুক্ত লবণ পৌঁছানো। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের অংশ হিসেবে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে শতভাগ সর্বজনীন আয়োডিনযুক্ত লবণ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছিল। তবে বর্তমান কার্যক্রম ও অগ্রগতির ধীরগতির কারণে নির্ধারিত সময়ে এই লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) একজন কর্মকর্তা জানান, ২০২২ সালের জাতীয় লবণনীতিতে ২০২৬ সাল পর্যন্ত আয়োডিনযুক্ত ভোজ্য লবণ উৎপাদনের একটি রূপরেখা দেওয়া রয়েছে। কিন্তু পরবর্তী নতুন লক্ষ্যমাত্রা এখনও নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।

 

নতুন লক্ষ্যমাত্রা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা না থাকার কারণ হিসেবে বিসিকের ওই কর্মকর্তা বলেন, "নতুন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের জন্য দেশব্যাপী নতুন জরিপ ও বিভিন্ন অ্যাসেসমেন্ট প্রয়োজন, যার জন্য বিপুল অর্থের দরকার। কিন্তু এখন পর্যন্ত এর বিপরীতে দেশি বা বিদেশি প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পাওয়া যায়নি। ফলে দীর্ঘমেয়াদি মূল কাজগুলো শুরু করা যাচ্ছে না; বর্তমানে যা হচ্ছে তা কেবল বিসিকের দৈনন্দিন দাপ্তরিক কার্যক্রমের অংশ।" 

 

তবে তিনি দাবি করেন, বর্তমানে প্রকৃত ব্যবহারকারী পরিবারের হার কাগজ-কলমের ৭৬ শতাংশের চেয়ে বেশি এবং তা প্রায় ৮০ শতাংশের কাছাকাছি। কিন্তু আনুষ্ঠানিক জরিপ ও বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত ছাড়া বিসিক আনুষ্ঠানিকভাবে তা ঘোষণা করতে পারছে না।

 

বিসিকের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৩ সালে আয়োডিনযুক্ত লবণের মাধ্যমে দেশে আয়োডিনের ঘাটতি পূরণের এই সুনির্দিষ্ট কার্যক্রম চালু হয়। ওই সময় দেশে সঠিক মাত্রায় আয়োডিন গ্রহণের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৯ শতাংশ। সরকারি-বেসরকারি ধারাবাহিক প্রচার ও সহযোগিতায় তিন দশকে তা বেড়ে ৭৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ তিন দশকে মাত্র ৭ পয়েন্ট অগ্রগতি হয়েছে। আদর্শ ৯০ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে আরও ১৪ পয়েন্টের যে পথ বাকি, তা অতিক্রমে পরিষ্কার রোডম্যাপ আপাতত অনুপস্থিত।

 

আয়োডিন গ্রহণের হার বৃদ্ধির ফলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং আয়োডিন গ্লোবাল নেটওয়ার্কের (আইজিএন) বৈশ্বিক মূল্যায়নে বাংলাদেশ 'আয়োডিন পুষ্টিতে পর্যাপ্ততা অর্জনকারী' দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। দেশ থেকে দৃশ্যমান গলগণ্ড ও বামনত্বের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। তবে আশঙ্কার বিষয় হলো, জনসংখ্যার একটি বড় অংশ এখনও আয়োডিন ঘাটতির তীব্র ঝুঁকিতে রয়েছে।

 

২০১৯-২০ সালে পরিচালিত দ্বিতীয় জাতীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট জরিপ অনুযায়ী, দেশের ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের ২০ শতাংশ এবং প্রজননক্ষম (গর্ভবতী নন বা বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না এমন) নারীদের ৩০ শতাংশই আয়োডিন ঘাটতিতে ভুগছেন।

 

অন্যদিকে, আইসিডিডিআর,বি এবং জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের (আইপিএইচএন) মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) থেকে জানা যায়, দেশের প্রায় ৫৮ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবারে পর্যাপ্ত পরিমাণ আয়োডিনযুক্ত লবণ পাওয়া গেছে; ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবারে অপর্যাপ্ত আয়োডিন ছিল এবং প্রায় ২৩ দশমিক ৪ শতাংশ পরিবারের ব্যবহৃত লবণে কোনো আয়োডিনই পাওয়া যায়নি। 

 

এর আগে ২০১৫ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের জরিপে ৬৫ শতাংশ পরিবারে আয়োডিনযুক্ত লবণের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছিল।

 

আন্তর্জাতিক সূচক ও বৈশ্বিক পুষ্টি মানদণ্ড অনুযায়ী, সফলভাবে আইন প্রয়োগের মাধ্যমে ইউনিভার্সাল সল্ট আয়োডাইজেশন বাস্তবায়নের দিকে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তালিকাভুক্ত ৫৪টি দেশে এখনও তীব্র আয়োডিন ঘাটতি মারাত্মক জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিদ্যমান থাকলেও, বাংলাদেশ সেই 'লাল তালিকা' বা অতি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে পেরেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান পাকিস্তানের চেয়ে বেশ ভালো ও সন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে।

 

দেশে জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় ১৯৮৯ সালে আইনের মাধ্যমে ভোজ্যলবণে আয়োডিন সংযোজন বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ২০২১ সালে আইনটি সংশোধন ও যুগোপযোগী করে 'আয়োডিনযুক্ত লবণ আইন, ২০২১' পাশ করা হয়। নতুন এই আইনে ভোজ্য ও পশুখাদ্যের লবণে নির্ধারিত মাত্রার আয়োডিন না থাকলে সর্বোচ্চ ৩ বছরের কারাদণ্ড এবং ১৫ লাখ টাকা জরিমানার মতো কঠোর বিধান রাখা হয়েছে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল আইনের কঠোর প্রয়োগই যথেষ্ট নয়; প্রান্তিক পর্যায়ে শতভাগ মানসম্মত আয়োডিনযুক্ত লবণ পৌঁছাতে এবং মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করতে সরকারি অর্থায়নে অবিলম্বে নতুন জরিপ পরিচালনা ও সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

মন্তব্য (0)

কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করুন

মন্তব্যটি অনুমোদনের পর প্রকাশিত হবে।