কুষ্টিয়ায় সৈয়দ মাছ-উদ রুমী কলেজে জুলাই মাসের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বিল পাস হয়েছে জেলা বিএনপির বিলুপ্ত কমিটির সভাপতি সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমীর স্বাক্ষরে। গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাতারাতি ওই কলেজের সভাপতি ও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে হটিয়ে কলেজ দখল করেন মেহেদী আহমেদ রুমী ও প্রাক্তন অধ্যক্ষ নুরুদ্দিন মো. সেলিম।
অভিযোগ উঠেছে, কলেজ পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি না হয়েও অবৈধভাবে বেতন-ভাতায় স্বাক্ষর করেছেন মেহেদী আহমেদ রুমী। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসককে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ কানিজ ফাতিমা।
জানা গেছে, গত ২০ আগস্ট কলেজ পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পান জেলা প্রশাসক। তবে ৮ আগস্ট ব্যাংকে মাছ-উদ রুমী কলেজের দাখিল করা বেতনসহ অন্যান্য বিলে সভাপতির জায়গায় স্বাক্ষর করেন বিএনপি নেতা রুমী। এ ছাড়া ওই বিলে আরও স্বাক্ষর করেছেন রুমীর অনুগত প্রাক্তন অধ্যক্ষ নুরুদ্দিন মো. সেলিম ও সিনিয়র শিক্ষক মিজানুর রহমানের স্বাক্ষর রয়েছে। বিলটি পাস হলে ১৪ আগস্ট ব্যাংক থেকে বেতন-ভাতা তুলে নেন শিক্ষক-কর্মচারীরা।
কলেজের কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালনকালীন ২০১৪ সালে কলেজ ফান্ডের অর্থ আত্মসাৎ ও এক নারী সহকর্মীর শ্লীলতাহানির ঘটনায় নুরুদ্দিন মো. সেলিমকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পরে দুর্নীতি দমন কমিশন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্তে অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি প্রমাণ হলে ২০১৭ সালে কলেজ পরিচালনা পর্ষদ তাঁকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়। সে সময় পলাতক ছিলেন নুরুদ্দিন।
২০১৯ সালে নারী সহকর্মীর দায়ের করা মামলায় আদালত তাঁকে ১০ বছরের কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড করেন। সেই মামলায় কারাগারে যেতে হয় তাঁকে। পরে আপিল করে জামিন পান। তবে চাকরি ফিরে পেতে তিনি আদালতে আপিল বা মামলা করেননি। এরপর কানিজ ফাতিমাকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেয় কলেজ পরিচালনা পর্ষদ। এদিকে গত এপ্রিল মাসে কলেজ পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব পান অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলম গালিব।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীরা জানান, মেহেদী আহমেদ রুমী ২০০৬ সালে সর্বশেষ সভাপতি ছিলেন। এরপর তিনি আর পরিচালনা পর্ষদে আসতে পারেননি। ৫ আগস্টের পর সুযোগ বুঝে বহিষ্কৃত অধ্যক্ষ নুরুদ্দিন রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কলেজ দখল করে নেন। এই সুযোগে নিজের অবস্থান পোক্ত করতে জেলা বিএনপির সভাপতি রুমীকে ব্যবহার করেন। সব নিয়মনীতি ভঙ্গ করে কানিজ ফাতিমাকে সরিয়ে দিয়ে জুলাই মাসের বেতন-ভাতার বিলে স্বাক্ষর করেন। সেখানে জাহাঙ্গীর গালিবের পরিবর্তে সভাপতির জায়গায় স্বাক্ষর করেন জেলা বিএনপি সভাপতি মেহেদী আহমেদ রুমী।
স্থানীয় রূপালী ব্যাংক শাখা সূত্রে জানা গেছে, এর আগে কানিজ ফাতেমা ও গালিব স্বাক্ষরিত বিল ছাড় না করে চাপের কারণে ব্যাংক ম্যানেজার তা আটকে রাখেন। পরে নুরুদ্দিন ও মেহেদী রুমীর স্বাক্ষর করা বেতন-ভাতা ছাড় করেন। বিলের অর্থ তুলে দেন নুরুদ্দিনের হাতে।
এ বিষয়ে রূপালী ব্যাংকের ম্যানেজার মুজিব আলম বলেন, ‘ওই বিলে ঝামেলা হতে পারে দেখে বিলে ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে অঙ্গীকার নেওয়া আছে। কোনো ব্যত্যয় হলে পরের মাসের বিল দেওয়া হবে না।’
অভিযোগ প্রসঙ্গে নুরুদ্দিন মো. সেলিম বলেন, তিনি কলেজের বৈধ অধ্যক্ষ। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মিথ্যা মামলা দিয়ে তাঁকে কলেজের বাইরে রেখেছিল। কলেজে আসতে দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে তিনি থানায় জিডিও করেছিলেন। তাই তাঁকে নাশকতা মামলায় আসামি করা হয়েছিল। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে তাঁকে অন্যায়ভাবে সাসপেন্ড করা হয়েছিল।
এ বিষয়ে জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমী বলেন, কলেজে জুলাই মাসে যে বেতন-ভাতার বিল উঠেছে সেখানে আমার স্বাক্ষর আছে। তিনি কলেজ পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ছিলেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি ওই কলেজের সভাপতি ছিলেন।
কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক (ভারপ্রাপ্ত) শারমিন আক্তার বলেন, বিষয়টি নিয়ে একটি লিখিত অভিযোগ এসেছে। কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।





