Friday, 4 September 2026
শিরোনাম
জেলার খবর

কারাগারে রক্তাক্ত বিদ্রোহ: ৭ বন্দির মৃত্যু, এখনও গেঁথে আছে দগদগে স্মৃতি

admin • 08 Aug 2025, 10:04 PM • পঠিত 3 বার
শেয়ার করুন:
কারাগারে রক্তাক্ত বিদ্রোহ: ৭ বন্দির মৃত্যু, এখনও গেঁথে আছে দগদগে স্মৃতি

 / ফিরে দেখা ভয়াল ৮ আগস্ট: জামালপুর কারাগারে রক্তাক্ত বিদ্রোহ, নিহত ৭ আহত ১৯

২০২৪ সালের ৮ আগস্ট—বাংলাদেশের কারা ইতিহাসে ভয়াল এক দিন। জামালপুর জেলা কারাগারে ঘটে যায় স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী বিদ্রোহ। কারা কর্তৃপক্ষকে জিম্মি করে ফটক ভেঙে পালানোর চেষ্টাকালে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান ৭ বন্দি।

 

সেইসাথে আহত হন অন্তত ১৯ জন, যাদের মধ্যে ছিলেন জেলারসহ ১৪ জন কারারক্ষী ও ৫ জন বন্দি। প্রায় নয় ঘণ্টা ধরে চলা সেই তাণ্ডব, আগুন ও সংঘর্ষের স্মৃতি আজও তাড়িয়ে বেড়ায় জামালপুরবাসীকে। ভয়াল সেই দিন যেভাবে শুরু হয়: বৃহস্পতিবার, ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট, দুপুর ১টায় কারাগারের অভ্যন্তরে হঠাৎ উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

 

বন্দিরা দুই পক্ষের বিভাজনে জড়িয়ে পড়ে সংঘর্ষে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন থেকে গ্রেপ্তার হওয়া শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক মামলার কয়েকজন বন্দির মুক্তির খবরে কারাগারের অন্যান্য বন্দিদের মাঝে ক্ষোভ দেখা দেয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বন্দিদের একটি দল হাতে নেয় বিদ্রোহের নেতৃত্ব। তারা প্রথমে দায়িত্বরত কারারক্ষীদের হাত-পা বেঁধে জিম্মি করে। এরপর জেলারের কক্ষে গিয়ে প্রধান ফটক খুলে দিতে চাপ প্রয়োগ করে।

 

জেলারের অস্বীকৃতিতে তাকে মারধর করে বিদ্রোহীরা। পরে অপর পক্ষের বন্দি ও কিছু কারারক্ষীর সহায়তায় জেলারের উদ্ধার হয়।

 

আগুন, গুলিবর্ষণ ও মৃত্যু:

বিদ্রোহীরা এরপর ছড়িয়ে পড়ে কারাগারের বিভিন্ন প্রান্তে। তারা ভাঙচুর চালায় বন্দি সেল এবং প্রশাসনিক ভবনে। সাতটি সেলে ও জেলারের কক্ষে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এসময় নিরাপত্তা রক্ষার্থে শতাধিক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়তে বাধ্য হয় কারারক্ষীরা। জরুরি পরিস্থিতিতে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় সেনাবাহিনী, র্যাব ও পুলিশ সদস্যরা। রাত ১০টার দিকে যৌথ অভিযানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে তার আগেই ছয় বন্দির প্রাণ ঝরে পড়ে গুলির আঘাতে। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় আরও এক বন্দি। 

 

নিহত ও আহতদের পরিচয়:

নিহত বন্দিরা হলেন—মো. আরমান, মো. রায়হান, শ্যামল, ফজলে রাব্বি ওরফে বাবু, মো. জসিম ও মো. রাহাত। সবার বাড়ি জামালপুর সদর উপজেলায়। বয়স ছিল ৩০ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে। এছাড়া একদিন পর হাসাপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মো.মাসুদ (৩০) নামের এক কয়েদী। তাঁর বাড়িও জামালপুর শহরের বনপাড়া এলাকায়। এছাড়া আহতরা সে-সময় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ও জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়।

 

যা বলেছিল সে সময়ের জেলার: বৃহস্পতিবার ৮ আগস্ট গণমাধ্যমকে কোনো তথ্য দেয়নি কতৃপক্ষ। ঘটনার পরদিন ৯ আগস্ট সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন তৎকালীন জেলার আবু ফাতাহ। 

 

সে সময় তিনি বলেন, “বন্দিদের মধ্যে হঠাৎ উত্তেজনা দেখা দেয়। এক পক্ষ অন্য পক্ষকে মারধর করতে শুরু করে। পরিস্থিতি এমন অবস্থায় পৌঁছায় যে, আমাদের প্রাণ রক্ষা করাটাই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।” তিনি আরও বলেছিলেন, “বিদ্রোহীরা আমাকে ও কারারক্ষীদের মারধর করে। আমরা আত্মরক্ষার্থে গুলি চালাতে বাধ্য হই। এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।”

 

এখনকার বাস্তবতা: 

এ বিষয়ে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে জামালপুর জেলা কারাগারের বর্তমান জেলার মোহাম্মদ শাহ আলম মুঠোফোনে জানান, ২০২৪ সালের ওই ঘটনার পর থেকে কারাগারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে। বন্দিদের চলাফেরা, অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম এবং পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে বিশেষ নজরদারির আওতায়। বর্তমানে কারাগারে কোনো ধরনের নিরাপত্তা ঘাটতি নেই।”

 

তিনি আরও জানান, “বর্তমানে জামালপুর জেলা কারাগারে মোট ৭৫৪ জন বন্দি রয়েছেন। এর মধ্যে সাজাপ্রাপ্ত বন্দির সংখ্যা ১৩০ জন। কেউ পলাতক নেই। সব বন্দি নিয়ম অনুযায়ী কারা শৃঙ্খলার আওতায় রয়েছে।” প্রসঙ্গত, জামালপুর জেলা কারাগারে সেই সময় মোট বন্দি ছিলেন ৬৬৯ জন, যাদের মধ্যে সাজাপ্রাপ্ত ছিলেন ১০০ জন।

   

সেই রাতের বিভীষিকা আজও কর্মরত কারারক্ষীদের স্মৃতিতে জ্বলজ্বলে। ঘটনার এক বছর পর, ২০২৫ সালের এই আগস্টে দাঁড়িয়ে জামালপুরবাসী ফিরে দেখে এক ভয়াল বিকেলের স্মৃতি, যেখানে জীবন, মৃত্যু ও দায়িত্ববোধের এক নিষ্ঠুর লড়াই চলেছিল প্রাচীরঘেরা দেয়ালের অন্তরালে।

মন্তব্য (0)

কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করুন

মন্তব্যটি অনুমোদনের পর প্রকাশিত হবে।