Thursday, 3 September 2026
শিরোনাম
জেলার খবর

সুদ নিয়ে প্রাণ যায়, বাড়িঘরও

admin • 26 Oct 2023, 07:00 PM • পঠিত 1 বার
শেয়ার করুন:
সুদ নিয়ে প্রাণ যায়, বাড়িঘরও

কুমারখালীর কয়া ইউনিয়নের উত্তর কয়া গ্রামের কারিগরপাড়ার বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম। ১৭ সেপ্টেম্বর দুপুরে তাঁর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। স্বজনের অভিযোগ, ধারে নেওয়া টাকার সুদ পরিশোধে রাজি না হওয়ায় সিরাজুলকে হত্যা করে ঝুলিয়ে রাখা হয় লাশ। এ ঘটনায় থানায় মামলা নেওয়া হয়নি। বাধ্য হয়ে আদালতে মামলা করেন সিরাজুলের মেয়ে মোছা. লাবনী খাতুন। এক মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও কোনো আসামি গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। তারা এলাকায় সদর্পে সুদের কারবার চালিয়ে যাচ্ছে।

লাবনীর মামলার আসামিরা হলো– একই গ্রামের তিন সহোদর মো. পিকলু, মো. বিপ্লব হোসেন ও মো. নয়ন হোসেন, তাদের বাবা মো. নাসির উদ্দিন; সেলিম মণ্ডল, কোরবান আলী শেখ ও মো. হাবিল। লাবনীর ভাষ্য, তাঁর বাবা আনুমানিক ১১ মাস আগে নয়নের কাছ থেকে এক লাখ টাকা ধার নিয়েছিলেন। ১৫ সেপ্টেম্বর সুদসহ এক লাখ ৮০ হাজার টাকা দাবি করে নয়ন। কিন্তু এত টাকা দিতে অস্বীকার করেন সিরাজুল। এ সময় নয়ন গালাগাল করে চলে যান।

 

লাবনী বলেন, ‘১৭ সেপ্টেম্বর সকালে নয়ন দেশীয় অস্ত্রসহ সহযোগীদের নিয়ে আমাদের বাড়িতে আসে। তারা ঘরবাড়ি ভাঙচুর করে জমি দখল শুরু করে।’ এতে বাধা দেন সিরাজুল। ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁকে পিটিয়ে হত্যার পর সিরাজুলের ভাই ডাবলুর ঘরের বারান্দায় লাশ ঝুলিয়ে রাখে। পরে আত্মহত্যার প্রচার চালায় তারা। সেদিনই সিরাজুলের স্ত্রী ঝর্ণা খাতুন থানায় হত্যা মামলা করতে যান।

   

কিন্তু পুলিশ সুদ কারিবারিদের বিরুদ্ধে মামলা না নিয়ে তাঁর অজান্তে ইউডি মামলায় টিপসই নেয়। ২০ সেপ্টেম্বর সাতজনের বিরুদ্ধে কুষ্টিয়া সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কুমারখালী আমলি আদালতে হত্যা মামলা (সিআর মামলা নম্বর-৩৫৫/২০২৩) করেন মেয়ে লাবনী। তাঁর অভিযোগ, ইউডি মামলায় তাঁর মায়ের টিপসই নিয়ে পুলিশ পাহারা দিয়ে গভীর রাতে লাশ দাফনে বাধ্য করে। তিনি ন্যায়বিচারের আশায় আদালতে মামলা করেছেন।

 

এ পক্ষে মামলা পরিচালনা করছেন আইনজীবী রূপালী খাতুন। তিনি বলেন, সুদের টাকার জন্য জমি দখল করতে না পেরে অমানবিকভাবে হত্যা করা হয়েছে সিরাজুলকে। তাঁর ভাষ্য, পুলিশের অসৎ কিছু কর্মকর্তার ছত্রছায়ায় দীর্ঘদিন ধরে পিকলু, নয়ন ও বিপ্লব সুদের কারবার চালিয়ে যাচ্ছে। সিরাজুলের মৃত্যুর মাসতিনেক আগে একই ইউনিয়নের কয়া গ্রামের কামারতলার বাড়িতে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন সরোয়ার হোসেন (৩৭)। মৃত কুতুব উদ্দিনের ছেলে সরোয়ার ছিলেন স্বর্ণকার। শুরুতে তাঁর আত্মহত্যার কারণ নিয়ে ধোঁয়াশায় ছিলেন স্বজন। সরোয়ারের ভাই আনোয়ার হোসেনের ভাষ্য, লাশ দাফনের পরদিন নাসির উদ্দিন, তার ছেলে নয়ন ও পিকলু দলবলসহ বাড়িতে এসে পাওনা হিসেবে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করে। তখন তিনি ভাইয়ের মৃত্যুর কারণ বুঝতে পারেন।

   

ওই টাকার জন্য সরোয়ারের স্ত্রী শারমিন সুলতানাকে নিয়মিত হুমকি-ধমকি দিতে থাকে সুদ কারবারিরা। বিষয়টি মৌখিকভাবে থানায় জানিয়েও লাভ হয়নি। অবশেষে ঘরবাড়িতে তালা দিয়ে শিশু সন্তানসহ গ্রাম ছেড়েছেন শারমিন। আনোয়ার হোসেন বলেন, ভুয়া সমিতি খুলে পশ্চিম কয়া গ্রামের মো. নাসির উদ্দিনের তিন ছেলে নয়ন, বিপ্লব ও পিকলু ঋণ বিতরণের নামে সুদের কারবার করছে।

   

তাদের কাছ থেকে মৃত্যুর প্রায় ৬ মাস আগে ৫০ হাজার টাকা নিয়েছিলেন সরোয়ার। ওই টাকার চাপ সইতে না পেরে তিনি আত্মহত্যা করেন। আর তাঁর স্ত্রী হয়েছেন গ্রামছাড়া। তিন ভাইয়ের সুদের কারবারের কারণে আশপাশের গ্রামে কেউ হচ্ছে লাশ, কেউ হারাচ্ছেন ভিটাবাড়ি। একই গ্রামের মৃত লিটনের স্ত্রী ভানু খাতুন জানান, সুদের টাকা শোধ করতে না পারায় প্রায় পাঁচ মাস আগে তাঁর বসতভিটার জমি লিখে নিয়েছে পিকলু ও বিপ্লব। তার দিয়ে ঘিরে রেখেছে জায়গাটি। সেখান থেকে ভানু খাতুনকে উচ্ছেদের জন্য হুমকি দিচ্ছে। তিনি আদালতে মামলা করবেন।

 

বালু ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিনের বাড়ি ওই গ্রামে। তিনি বলেন, ওরা প্রথমে সুদের ওপর টাকা দেয়। পরে জায়গা লিখে নিয়ে বেড়া দিয়ে দখল করে নেয়। তাদের অত্যাচারে তিন মাসের ব্যবধানে দুইজন মারা গেছেন। এদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি। আনুমানিক ১৫ বছর আগে কয়া কামারতলার আবদুস সাত্তারের (৫৮) ঘরবাড়ি,দোকানসহ প্রায় ৯ শতাংশ জমি জালিয়াতি করে লিখে নেয় তিন ভাই। দোকানের পেছনের অংশেই কার্যালয় খুলে সুদের কারবার চালিয়ে যাচ্ছে তারা। বর্তমানে সাত্তার থাকেন ঘোড়াইঘাট এলাকায়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোবাইল ফোনে আক্ষেপ ঝরে সাত্তারের কণ্ঠে। তিনি বলেন, ‘যা হবার হয়ে গেছে।

   

এসব বলে তো আর জমি ফিরে পাব না।’ এ বিষয়ে তিনি আর কিছু বলতে চাননি। এলাকাবাসী জানান, নাসির উদ্দিনের বড় ছেলে নয়ন বিআরবি কেবলসে কুষ্টিয়া কার্যালয়ে কর্মরত। মেজ ছেলে বিপ্লব সম্প্রতি একই কোম্পানির চাকরি ছেড়েছে। ছোট ছেলে পিকলুর মালিকানায় কয়া বাজারে মাংসের ব্যবসা রয়েছে। তিন ভাই দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের নাকের ডগায় সুদের কারবার করে আসছে। ‘নদী ফাউন্ডেশন’ ও ‘বাঘা যতীন পল্লি উন্নয়ন সংস্থা’ থেকে ঋণ বিতরণের আড়ালে চড়া সুদে টাকা ধার দেয়। চাহিদামতো সময়ে টাকা শোধ না করলেই শুরু হয় শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার। পরে ঋণগ্রহীতাদের জিম্মি করে বায়নানামার মাধ্যমে জমি-বসতভিটা দখল করে নেয়।

   

সম্প্রতি বাড়িতে গিয়ে নাসির উদ্দিন ও তার তিন ছেলেকে পাওয়া যায়নি। তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেন নাসিরের স্ত্রী। তাদের কোনো সমিতি নেই দাবি করে বলেন, তারা সুদের কারবারে জড়িত নন। যেসব জমি দখলের অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো কেনা। পুলিশ সব জানে। সিরাজুলের মৃত্যুর ঘটনায় মামলার তথ্য জেনেছে মো. পিকলু। মোবাইল ফোনে সে বলে, ‘এলাকায় এসে সবার কাছে শুনে আপনার যেইটা ভালো মনে হয়, সেইটা লেখেন।’ সুদ কারবার বিষয়ে এলাকাবাসীর তথ্য বিষয়ে জানতে চাইলে তার জবাব, ‘তাহলে তাই লিখে দেন।’ পরে ফোনের সংযোগ কেটে দেয়। বারবার কল দিলেও ধরেনি।

 

দু’জনের মৃত্যুর পর তদন্ত করে ওই তিন ভাইয়ের সুদের কারবারের সত্যতা পেয়েছেন বলে জানান কয়া ইউপি চেয়ারম্যান মো. আলী হোসেন। তিনি বলেন, সুদের কারণেই দু’জন মারা গেছেন। অনেকে জায়গা-জমি হারিয়েছেন। এসব বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি কুমারখালী থানার ওসি মো. আকিবুল ইসলাম। তিনি জেলা পুলিশের বক্তব্য নেওয়ার পরামর্শ দেন।

   

কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. আবু রাসেল বলেন, ওসি কেন মামলা নেননি–খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে। যেহেতু আদালতে মামলা হয়েছে, সেহেতু আইন অনুযায়ী সুষ্ঠু তদন্ত হবে। কয়ার ঘটনার তদন্ত চলছে উল্লেখ করে কুমারখালীর ইউএনও বিতান কুমার মণ্ডল বলেন, পরে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মন্তব্য (0)

কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করুন

মন্তব্যটি অনুমোদনের পর প্রকাশিত হবে।