Thursday, 3 September 2026
শিরোনাম
মতামত

সু-কথা কু-কথা এবং প্রতিবন্ধকতা

admin • 04 Jul 2024, 10:41 PM • পঠিত 3 বার
শেয়ার করুন:
সু-কথা কু-কথা এবং প্রতিবন্ধকতা

কথা একটি শৈল্পিক নৈপূর্ণতা। কথা একটি শক্তি।কথা আত্মার খোরাক। জমাট বাঁধা বদ রক্তের ক্ষতে কথা পেনিসিলিন এর প্রলেপ।কথা বন্ধুর বন্ধনের রশি, যুদ্ধে শত্রুকে কুপোকাতের মসি।কথা ব্যক্তিত্বের প্রতিচ্ছবি,মনীষীর অমোঘ বাণ। কথা আপন মনে গেয়ে চলা চারণ কবির গান।

কথায় সুপ্ত রয়েছে অনন্ত কালের মহিমা, অফুরন্ত রহস্য আর সপ্তরঙের বৈচিত্র্যতা।একটি ভালো কথা একটি সুবৃক্ষের মতই পবিত্র গুণসম্পন্ন। যার ছায়া,মায়া ও ফল তিনটি ই সুমিষ্ট।পক্ষান্তরে কুকথা কুবৃক্ষের ই প্রতিরুপ। যার শনিরুপ ছায়া, মায়ারুপ ছলনা আর বিষ মাখানো ফল তিনটি ই তিক্ত এবং ভয়ানক প্রাণঘাতী। এসবের বাইরেও 'কথার কথা' নামে কথার রয়েছে আরেকটি প্রজাতি। এটি প্রাণঘাতীর মত অতটা বিপজ্জনক না হলেও মহামূল্যবান সময়ঘাতী।

ঈশপের ব্যক্তি জীবনের একটি ঘটনা থেকে হিতবাকে ্যর গুন এবং কটুবাক্যের অপগুন সম্পর্কে একটা চমৎকার ধারনা পাওয়া য়ায়।উপকথায় জন্য জগৎখ্যাত ঈশপ তার প্রথম জীবনে একজন ভীত্য( দাস) হিসেবে অন্যের বাড়িতে কাজ করতেন।এক প্রাতে মনীব তাকে ডেকে বললেন,ঈশপ আজ বাজার থেকে আমার জন্য এমন একটা জিনিস আনবে যেটি তোমার কাছে সবচেয়ে ভালো বস্তু বলে মনে হয়। ঈশপ সমগ্র বাজার ঘুরে ছাগলের একটা জিহ্বা নিয়ে ফিরে আসলেন। এবং সেটি যথারীতি মালিক কে দিলেন। পরদিন মনীব সবচেয়ে মন্দ জিনিসটি আনতে বলে।ঈশপ সেদিনও আরেকটি ছাগলের জিহ্বা এনেই মনীবকে দেয়। মনীব তার এমন উদ্ভট কাণ্ডের কারণ জানতে চাইলে ঈশপ ব্যাখ্যায় বলেন,"মনীব এই জিহ্বা দিয়ে সত্য কথা বলা যায়। একটা সত্য কথার চেয়ে সুন্দর আর কিই বা হতে পারে । পক্ষান্তরে একই জিহ্বা দিয়ে আবার মিথ্যাও বলা যায়। আর একটা মিথ্যার চেয়ে ভয়ানক কুৎসিত আর দ্বিতীয়টি হতে পারে না। তবে মানুষের জিহ্বা তো আর আনা সম্ভব না। তাই এই ছাগলের জিহ্বা এনেছি। জিহ্বা নিয়ে উমর (রা.) বর্ণিত আরেকটি ঘটনা এখানে না বললেই নয়। তিনি বলেন:"আমি একবার আবু বকর (রা.) বাড়ি গেলাম। গিয়ে দেখি তিনি নিজের জিহ্বা ধরে টানাটানি করছেন। আমি বললাম আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন, আপনার কি হয়েছে? আবু বকর বললেন: এ জিহ্বা আমাকে ডুবিয়েছে"।

উত্তরাধিকার সূত্রেই আমি একজন নিরেট অন্তর্মূখী স্বভাবের ( introvert person) মানুষ। নেহাতই প্রয়োজন ছাড়া কথার খরচাপাতি আমার ধাতে নেই এবং ব্যাপারখানা রীতিমতো আমার স্বভাববিরুদ্ধ। কিন্তু ঐ যে আবার ওই কথায়ই আছে,"যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই ভোর হয়"। প্রাচীন এই নীতি বচনটি যে সগত্রীয়দের সাথে সাথে আমার জন্যও পয়দা হয়েছে সে হিসেব মেলাতেই জীবনের অর্ধেকটা পার। এবং খাঁটি বাস্তবতা হলো, আমি এখন পুরোদস্তুর একজন কথার ফেরিওয়ালা অর্থাৎ কলমজীবী। হৃদয়ে বিপ্লবী চেতনা লালন করে এমন মানুষদের ভাষায়"কলমযোদ্ধা"। দেশের চতুর্থ স্তম্ভ 'গণমাধ্যম' এবং আমি সেই স্তম্ভ রক্ষার একজন সক্রিয় কর্মী। নৈতিক কাজের পাশাপাশি সমাজে ঘটে যাওয়া অনিয়ম, দুর্নীতি,খুন,যখম আর রাহাজানির চিত্রনাট্য কলমের কালিতে ইনপুট (input)দিয়ে সংবাদ সদৃশ অবয়ব দান এবং তৎপরবর্তীতে মানুষের দোরগোড়ায় সেগুলি আউটপুট(output ) দেয়াটাই আমার কাজ। অনেকদিন আগে নাট্যসুধীজন আব্দুল্লাহ আল মামুন নানা অনিয়মে ব্যাধীগ্রস্থ সমাজের প্রেক্ষাপটে "সুবচন নির্বাসনে" শিরোনামে একটি নাটক রচেছিলেন। একজন কলমযোদ্ধা হিসেবে নির্বাসিত সেই সুবচন পুর্ণউদ্ধার ও জনমণে সেটি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার কাজ টি যে কত দুরুহ সেটি ব্যক্ত করতে দরবেশ লালন সাঁইজির গানের সুরে সুর মিলিয়ে বলতে ইচ্ছে হয়,"আমার বেদন বুঝবি নারে এক মরনে না মরিলে"।

 

অন্যদিকে নির্মল সত্য সুবচনের স্রোতধারার বেগে লাগাম টানতে উজান দেশের "ফারাক্কাবাঁধের" ন্যায় প্রগলভতক প্রভাবশালীদের হম্বিতম্বি ,তর্জন- গর্জন এমনকি নির্মম নৃশংস দণ্ডাদেশ কার্যকরের রীতি যে নতুন নয় সেটি প্রমাণে হাজার পৃষ্ঠার ইতিহাস বইয়ের পান্ডুলিপির পরিবর্তে শর্টকাট মেথডের পাটিগণিতের সূত্রের মত সক্রেটিস কিংবা গ্যালিলিও গ্যালিলির নাম দুটোই কি যথেষ্ট নয়?

তবে বলে রাখা ভালো, ঘাতকের নির্মমতা শুধু তাদের নশ্বর দেহটাই ছুঁতে পেরেছে। সতত পবিত্র আমিত তেজময় আত্মার বিচ্ছুরিত ঝলকানি নির্মম বর্বরতার পাহাড় ডিঙিয়ে ন চূড়োয় নিয়েছে অধিষ্ঠান। গনগনে সূর্যের আলোকরশ্মি হয়ে প্রতিটি মানব আত্মায় অদ্যাবধি যোগাচ্ছে শক্তির রসদ। কিন্তু কেন তারা জেনে বুঝে বরণ করলেন এমন যন্ত্রণাদায়ক মরণকে?

 

সেটির ব্যাখ্যা মেলে মিসাইল ম্যান খ্যাত পরমাণু বিজ্ঞানী ও ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এপিজে আবদুল কালাম আজাদের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ "Wings of Fire" এ বর্ণিত তার স্মৃতিচারণা থেকে। তিনি লিখেছেন,"আমি গ্রীসে গিয়ে"সক্রেটিস কেভ"দেখতে গেলাম। গুহার ভেতরে গিয়ে আমার মনের মধ্যে এক ধরনের ধ্যান গম্ভীর ভাব বিরাজ করছিল। আমি ভেবে বিস্মিত হলাম, বিশ্বের মহানতম চিন্তা নায়কদের মধ্যে অন্যতম হয়েও কেন তাকে বিষ খাইয়ে হত্যা করা হয়েছিল। তৎক্ষণাৎ আমার স্মরণ হল, তার জীবনের চেয়েও তার বাণী ছিল গুরুত্বপূর্ণ"।

গ্রীস এয়ারলাইন্সের ফিরতি প্লেনে এবার দেশে ফেরা যাক। উত্তর খুঁজে বের করা যাক আপন মনে দানা বাধা কিছু বিস্ময়ের। শৈশব থেকেই বঙ্গবন্ধুর দেয়া ঐতিহাসিক ৭-ই মার্চের ভাষণ আমাকে একই সাথে বিমুগ্ধ ও বিস্মিত করে! একা একজন মানুষ কি উপায়ে সাত কোটি মানুষকে সম্মোহিত করে রক্তে মুক্তির শিহরণ জাগালেন সেটি রীতিমতো আমাকে ভাবিয়ে তোলে! আমি তার বক্তৃতার অফুরন্ত শক্তির উৎস খোঁজার চেষ্টা করলাম। প্রশ্নে প্রশ্নে জর্জরিত করলাম নিজেকে। খাদ্যের সুষম উপাদান যেমন শরীরকে শক্তিশালী করে তোলে তদ্রুপ কথাতেও কি শর্করার শক্তি ,ভিটামিনের মৃতসঞ্জীবনী কিংবা আমিষের পুষ্টিগুণ আছে? যেটি কথাকে এত শক্তির যোগান দেয়। কথাতেও কি জীবাণু ধ্বংসের ঔষধ আছে? যেটি এন্টিবায়োটিকের মত ধ্বংস করে শত্রুকে?

 

উত্তরটা হলো-যদি নাই থাকবে তবে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না। অত্যাচারীর কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে শেখ মুজিব স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করতে পারতেন না। স্বাধীন দেশের মাটিতে রচিত হতো না প্রত্যাবর্তনের ঐতিহাসিক সেই ভাষণ। যে ভাষণে তিনি বলেছিলেন-"আমার সেলের পাশে আমার জন্য কবর খোঁড়া হয়েছে। আমি প্রস্তুত হয়েছিলাম, বলেছিলাম, আমি বাঙালি, আমি মানুষ...... আমি মুসলমান, একবার মরে দুইবার মরে না....…. আমার মৃত্যুর এসে থাকে যদি আমি হাসতে হাসতে যাব, আমার বাঙালি জাতিকে অপমান করে যাব না, তোমাদের কাছে ক্ষমা চাইবো না এবং যাওয়ার সময় বলে যাব ,জয় বাংলা, স্বাধীন বাংলা, বাঙালি আমার জাতি, বাংলা আমার ভাষা ,বাংলার মাটি আমার স্থান।

 

কিন্তু আমরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিই না, উপরন্তু ভুলে যায়। তাই স্বাধীন বাংলায় স্বাধীন মত প্রকাশ হয় বাধাগ্রস্ত। মাদক ,দুর্নীতি আর অনিয়মের ফিরিস্তি থাকতে দেয়া হয় আইনের বেড়া।

 

অন্যদিকে আজিজ, বেনজির ,মতিউররা পাই আলাদিনের চেরাগ। যে চেরাগের দৈত্যের সহায়তায় পাহাড় সমান দুর্নীতির বেড়া ডিঙ্গিয়ে ইউরোপ-আমেরিকায় পাড়ি জমান দুর্নীতির কিংবদন্তি তুল্য এসব মহানায়কেরা। বাংলাদেশ 'আইন ও সালিশি কেন্দ্রের' চেয়ারপারসন জেড আই খান পান্নার একটি যথার্থ যুক্তি এখানে উপস্থাপন না করলে লেখাটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তিনি বলেন,"সাধারণত আমাদের দেশের আইন হচ্ছে মাকড়সার জালের মত। দুর্বল বা কম শক্তিধর হলে এতে আটকে যাবে; শক্তি বড় হলে এ জাল যে গায়ে লাগছে; সেটাও টের পাবে না"।

এখন প্রশ্ন জাগে? তাহলে কি আইন প্রণেতাগণ ধরেই নিয়েছেন যে সত্য কথা দুর্বল বা কম শক্তিধর। আমি বলবো না। অতটাও দুর্বল না যে মাকড়সার জলে আটকে যাবে। বরং সুবচনের স্ট্যামিনা পরিমাপের জন্য তাদের আরেকবার ৭-ই মার্চের ভাষণ শোনা উচিত। এবং তারপর আইন প্রণয়ন করলে অন্তত তাদের এই পণ্ডশ্রম লাঘব হত।

 

শেষ করব গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের একটি উদ্ধৃতি দিয়ে। নোবেল পুরস্কার অনুষ্ঠানে তিনি তার গুরু উইলিয়াম ফকনার কে উদ্ধৃত করে বলেছিলেন ,"মানুষের পরাজয় মেনে নিতে আমি অস্বীকার করি। তিনি বলেছিলেন, মানুষ হারবে না, তা এজন্য নয় যে তার ভাষা আছে, তা এজন্য যে তার আত্মা আছে"।

মন্তব্য (0)

কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করুন

মন্তব্যটি অনুমোদনের পর প্রকাশিত হবে।