Thursday, 3 September 2026
শিরোনাম
মতামত

ওষুধের স্যাম্পল কি সত্যিই কাজে লাগে?

admin • 14 Mar 2026, 11:02 AM • পঠিত 2 বার
শেয়ার করুন:
ওষুধের স্যাম্পল কি সত্যিই কাজে লাগে?
আমাদের দেশের ওষুধ শিল্পের উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থায় 'ওষুধের স্যাম্পল' বা নমুনা প্রদানের বিষয়টি দীর্ঘকাল ধরে একটি বৈধ রীতি হিসেবে প্রচলিত। নিয়ম অনুযায়ী, এই স্যাম্পলগুলো করমুক্ত (Tax-free) এবং এগুলো বিতরণের জন্য প্রতিটি ওষুধ কোম্পানির এক বিশাল শিক্ষিত ও দক্ষ জনবল (MPO/Representative) নিয়োজিত থাকে। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসার প্রেক্ষাপটে এই স্যাম্পল প্রথা কতটুকু যৌক্তিক, তা নিয়ে নতুন করে ভাববার সময় এসেছে।
স্যাম্পল কি সত্যিই কাজে লাগে?
একটি সাধারণ প্রশ্ন জাগে—চিকিৎসক যদি নিজে এই স্যাম্পল না সেবন করেন, তবে এর গন্তব্য কোথায়?
১. পরীক্ষামূলক প্রয়োগের সুযোগ নেই: অনেকে মনে করেন, চিকিৎসক রোগীকে স্যাম্পল দিয়ে ওষুধের গুণাগুণ বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া যাচাই করবেন। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানে এটি অসম্ভব। বর্তমানে যেকোনো ওষুধ বাজারে আসার আগে কঠোর ল্যাবরেটরি টেস্ট, প্রাণিদেহে পরীক্ষা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্পন্ন করেই সার্টিফিকেট পায়। এছাড়া স্যাম্পল হিসেবে যে পরিমাণ ওষুধ দেওয়া হয়, তা দিয়ে একজন রোগীর পূর্ণাঙ্গ কোর্স সম্পন্ন করা প্রায় অসম্ভব। ফলে এর মাধ্যমে ওষুধের কার্যকারিতা যাচাই করার বৈজ্ঞানিক কোনো ভিত্তি নেই।
২. আইনি জটিলতা:  প্রচলিত আইনে স্যাম্পল ওষুধ বাজারে বিক্রি করা দণ্ডনীয় অপরাধ। অথচ চিকিৎসক নিজে সেবন না করলে বা রোগীকে পর্যাপ্ত পরিমাণে দিতে না পারলে এই ওষুধের উপযোগিতা শূন্য হয়ে পড়ে।
স্যাম্পল প্রথার নেতিবাচক দিকসমূহ:
রাজস্ব ক্ষতি:  স্যাম্পল ওষুধগুলো ট্যাক্স ফ্রি হওয়ায় সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারায়। অথচ পরোক্ষভাবে এই ওষুধগুলোর একটি বড় অংশ কোনো না কোনো উপায়ে বাজারে বিক্রি হয়ে যায়।
মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার ঝুঁকি: স্যাম্পলগুলো অনেক সময় ছোট ছোট স্ট্রিপে বা কাটা অবস্থায় থাকে, যার ফলে অনেক ক্ষেত্রে এক্সপায়ারি ডেট বা মেয়াদের তারিখ বোঝা যায় না। দীর্ঘক্ষণ বস্তাবন্দি অবস্থায় পড়ে থাকায় অনেক ওষুধ গুণগত মান হারায় বা মেয়াদ পেরিয়ে যায়, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
চিকিৎসকদের বিড়ম্বনা: সাধারণ মানুষের ধারণা, চিকিৎসকরা স্যাম্পল পান বলে তাদের ওষুধ কিনতে হয় না। বাস্তব চিত্র ভিন্ন। প্রয়োজনীয় সময়ে সঠিক ওষুধটি খুঁজে পাওয়া যায় না অথবা তা পরিমাণে পর্যাপ্ত হয় না। উল্টো আত্মীয়স্বজন বা পরিচিতদের ধারণা থাকে যে চিকিৎসক সব ওষুধ বিনামূল্যে পাচ্ছেন, যা পেশাদারিত্বের ক্ষেত্রে বিড়ম্বনা তৈরি করে।
ভুল সেবনের আশঙ্কা: স্যাম্পল হিসেবে পাওয়া বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ওষুধ যখন রোগীদের সাহায্য হিসেবে দেওয়া হয়, তখন ব্র্যান্ডের নাম ভিন্ন হওয়ায় রোগীরা প্রায়ই বিভ্রান্ত হন। এতে ডোজ বা সময় উল্টে গিয়ে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সম্পদের অপচয়: এক বিশাল শিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তিকে শুধুমাত্র এই স্যাম্পল ব্যাগ বয়ে বেড়ানো এবং বিতরণের কাজে লাগানো জাতীয় মেধার অপচয়।
ওষুধের মূল্য বৃদ্ধি: স্যাম্পল তৈরি, প্যাকিং এবং পরিবহনের বিশাল খরচ পরোক্ষভাবে সাধারণ ওষুধের দাম বাড়িয়ে দেয়। অর্থাৎ, স্যাম্পলের ভার বহন করতে হয় সাধারণ ক্রেতাকেই।
আমাদের প্রত্যাশা
বর্তমানে অনেক স্বনামধন্য ওষুধ কোম্পানি স্যাম্পল ছাড়াই তাদের বিপণন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এমনকি অনেক সচেতন চিকিৎসক এখন স্যাম্পল গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন। এই 'দুষ্ট প্রথা' বন্ধ হলে ওষুধের উৎপাদন খরচ কমবে, যার সুফল পাবেন রোগীরা।
চিকিৎসক এবং ওষুধ কোম্পানির মধ্যকার অন্যান্য সম্পর্ক বা উপঢৌকন নিয়ে নানা বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু 'স্যাম্পল' নামক এই দৃশ্যমান অপচয় রোধ করা এখন সময়ের দাবি। আমি বিশ্বাস করি, অধিকাংশ চিকিৎসকই মনেপ্রাণে এই প্রথার অবসান চান। জনস্বার্থে এবং ওষুধের বাজার নিয়ন্ত্রণে এই স্যাম্পল প্রথা আইন করে নিষিদ্ধ করা জরুরি।
লেখক, অধ্যাপক ডা. সুরেশ তুলসান
প্রাক্তন অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান,
সার্জারী বিভাগ, কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ
মন্তব্য (0)

কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করুন

মন্তব্যটি অনুমোদনের পর প্রকাশিত হবে।