Thursday, 3 September 2026
শিরোনাম
ফিচার মতামত

শহীদ জিয়া থেকে তারেক রহমান: প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম

Sohag Shah • 18 Jul 2026, 10:33 PM • পঠিত 5 বার
শেয়ার করুন:
শহীদ জিয়া থেকে তারেক রহমান: প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম

শহীদ জিয়া থেকে তারেক রহমান: প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম

ছৈয়দ মুহাম্মদ রাসেল: তরুণ গবেষক ও সাবেক শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

প্রাসঙ্গিকতা না হারিয়ে তিন প্রজন্ম ধরে একটি সুসংহত ও ধারাবাহিক রাজনৈতিক দর্শন বহন করা- বাংলাদেশের খুব কম রাজনৈতিক ধারাই এমন একটি কৃতিত্ব দেখাতে পেরেছে।  অধিকাংশ রাজনৈতিক যাত্রা শুরু যেখানে, সেখানেই শেষ হয়ে যায়; একবার সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়, তারপর স্মৃতির অতলে হারিয়ে যায়। কিন্তু এই ধারাটি বারবার পরীক্ষিত হয়েছে- ১৯৭৫ সালে, ১৯৯১ সালে, ২০০১ সালে এবং এখন ২০২৬ সালে। প্রতিবারই এটি কেবল টিকেই থাকেনি; বরং  নিজ নিজ সময়ের প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত দিয়েছে।

এই যাত্রার সূচনা হয়েছিল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে। তিনি এমন এক বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যা রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত এবং অর্থনৈতিকভাবে বহুলাংশে বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল। সেই সংকটময় সময়ে তিনি দেশকে নতুন পথের দিশা দেখিয়েছিলেন। একদলীয় শাসনের পর তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন, গ্রাম সরকার ব্যবস্থার মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে শাসনব্যবস্থাকে জনগণের কাছাকাছি নিয়ে যান এবং এমন এক সময়ে বাংলাদেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে এগিয়ে দেন, যখন দেশটি তখনও বিদেশি সহায়তার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তিনি বেসরকারি উদ্যোগ ও মুক্তবাজারভিত্তিক অর্থনীতিকে উৎসাহিত করেন, রপ্তানিমুখী প্রবৃদ্ধির ভিত্তি স্থাপন করেন এবং মধ্যপ্রাচ্য, চীন ও বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তোলেন। পরবর্তীকালে এই সম্পর্কগুলোই প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) এবং তৈরি পোশাকশিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, যা আজও বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এটি ছিল নিঃসন্দেহে এক ভিত্তি নির্মাণের যুগ- যে ভিত্তির ওপর পরবর্তী উন্নয়নের অনেকটাই দাঁড়িয়ে আছে।

দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া (প্রয়াত) সেই ভিত্তির ওপর আস্থা ও স্থিতিশীলতার সঙ্গে পরবর্তী অধ্যায় সূচনা করেন। ১৯৯১–১৯৯৬ এবং পুনরায় ২০০১–২০০৬ সময়কালে তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকার সংসদীয় গণতন্ত্রকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও সুসংহত করে। তাঁর চালু করা ছাত্রী উপবৃত্তি কর্মসূচি (Girls' Education Stipend Programme) দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সফল শর্তসাপেক্ষ সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি হিসেবে স্বীকৃত, যা মেয়েদের শিক্ষায় অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং লিঙ্গবৈষম্য হ্রাসে পরিমাপযোগ্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। তাঁর আমলে গ্রামীণ সড়ক ও বিদ্যুতায়নের উল্লেখযোগ্য সম্প্রসারণ ঘটে, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি নীতির ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাসী অগ্রযাত্রা শুরু করে। রাজনৈতিকভাবে অস্থির এক সময়ে তাঁর নেতৃত্ব ছিল স্থির ও ধারাবাহিক; গণতন্ত্রের অর্জনকে তিনি কেবল সংরক্ষণই করেননি, বরং তা সাধারণ মানুষের জীবনে বাস্তব উন্নয়নে রূপান্তরিত করেছিলেন।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এখন এই উত্তরাধিকারকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, এবং তা করছেন উদ্যমের সঙ্গেই। দীর্ঘ সতেরো বছরের নির্বাসন শেষে, তিনি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আসেন এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপিকে একটি নিরঙ্কুশ বিজয়ের দিকে নেতৃত্ব দেন। এই রাজনৈতিক যাত্রার ভিত্তি ছিল ৩১ দফা কাঠামোগত সংস্কার কর্মপরিকল্পনা, যা স্পষ্টভাবে শহীদ জিয়ার ১৯ দফা কর্মসূচি এবং বেগম খালেদা জিয়ার Vision 2030-এর ধারাবাহিকতাকে ধারণ করে। এই অধ্যায়ের সবচেয়ে উৎসাহব্যঞ্জক দিক হলো বাস্তবায়নের গতি। সরকারের প্রথম একশ দিনের মধ্যেই দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে সরাসরি সহায়তা পৌঁছে দিতে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কর্মসূচি চালু করা হয়েছে; হজের ব্যয় কমানো হয়েছে; কৃষিঋণ মওকুফের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে; এবং সারা দেশে ভূমিসেবার ডিজিটাল রূপান্তর এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। একই সময়ে এক প্রান্তিকে রাজস্ব আদায় ১৩ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি অতিক্রম করেছে এবং গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী উচ্চ মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। এস আলম গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট সম্পদ জব্দ করা হয়েছে এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ইতোমধ্যেই বিভিন্ন চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। এসব পদক্ষেপ দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের ঘোষিত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির বাস্তব প্রতিফলন হিসেবেই প্রকাশ পায়।

অবশ্যই এই অগ্রযাত্রার অর্থ এই নয় যে সামনে আর কোনো চ্যালেঞ্জ নেই। বরং এখনও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাকি রয়েছে। মূল্যস্ফীতি আরও কমিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে হবে; বেসরকারি বিনিয়োগে আস্থা পুনরুদ্ধারে আরও সময় লাগবে; এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার উচ্চাভিলাষ বাস্তবায়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টা প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে একটি অস্থির আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক পরিবেশে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নতুন পরীক্ষার মুখোমুখি, আর বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারও একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক পরিবেশে স্বাভাবিকভাবেই গভীর পর্যবেক্ষণের অধীনে রয়েছে। তবে মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তা, ডিজিটাল রূপান্তর এবং সম্পদ পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি দেখা গেছে, তা নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য। একটি সরকার তার যাত্রার সূচনাতেই যদি এমন গতিশীলতা প্রদর্শন করতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও রাষ্ট্রগঠনের কঠিন কাজগুলো সফলভাবে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও যথেষ্ট আশাবাদী হওয়া যায়।

এই ধারাবাহিকতার বয়ানকে অবশ্য আরও বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে দেখা যেতে পারে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে পারিবারিক নেতৃত্বের ধারা একটি সুপরিচিত বৈশিষ্ট্য, আর এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থাকা স্বাভাবিক- কেউ একে ধারাবাহিকতা ও অভিজ্ঞতার সঞ্চালন হিসেবে দেখেন, আবার কেউ চান নেতৃত্ব-কাঠামোয় আরও বৈচিত্র্য ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ। একইভাবে, বর্তমান সরকারের প্রথম একশ দিনের অর্জনগুলো নিঃসন্দেহে উৎসাহব্যঞ্জক, তবে যেকোনো নতুন সরকারের ক্ষেত্রেই স্বল্পমেয়াদি সাফল্যকে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে রূপান্তর করাই মূল চ্যালেঞ্জ থেকে যায়- এবং এই যাত্রায় বিরোধী দল, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের গঠনমূলক পর্যবেক্ষণ বরং সরকারের জন্য সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ হিসেবেই কাজ করতে পারে।

এই বহুমাত্রিক আলোচনার পরও, সমগ্র ধারাবাহিকতাকে একসঙ্গে দেখলে একটি সুস্পষ্ট বর্ণনা সামনে আসে- ভিত্তি নির্মাণ, সেই ভিত্তির সংহতি এবং সময়ের প্রয়োজনে তার নবায়ন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যে দর্শনের বীজ রোপণ করেছিলেন, বেগম খালেদা জিয়া তা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে আরও সুদৃঢ় করেন; আর আজ তারেক রহমান সেই উত্তরাধিকারকে এক নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশে, নতুন বাস্তবতা ও নতুন চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষাপটে পুনর্ব্যাখ্যা করার প্রয়াসে রয়েছেন। ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ই তাই আগের অধ্যায়ের পুনরাবৃত্তি নয়, বরং তার স্বাভাবিক পরিণতি। আর যদি বর্তমান অধ্যায়ের সূচনালগ্ন ভবিষ্যতের কোনো ইঙ্গিত বহন করে, তবে আশা করা যায় এই যাত্রাও শেষ পর্যন্ত স্মরণীয় হয়ে থাকবে; কেবল রাজনৈতিক অঙ্গীকারের জন্য নয়, বরং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গঠন, নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন এবং সাধারণ মানুষের জীবনে স্থায়ী ইতিবাচক পরিবর্তন আনার মধ্য দিয়ে- যেমনটি একটি সত্যিকারের উত্তরাধিকার প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে নিয়ে চলে।

 
মন্তব্য (0)

কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করুন

মন্তব্যটি অনুমোদনের পর প্রকাশিত হবে।