একজন সচেতন মা মাত্রই একটি সুশিক্ষিত জাতির কারিগর। আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ এবং বেগম রোকেয়া দিবস (৯ ডিসেম্বর- ২০২৪) উপলক্ষ্যে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দেশব্যাপী পরিচালিত “জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ” শীর্ষক কার্যক্রমের আওতায় সফল জননী হিসেবে সাফল্য অর্জনকারী নারী ক্যাটাগরীতে মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার শ্রেষ্ঠ জয়িতা সম্মাননা পান রোকেয়া রহমান। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক সুলতানা আক্তারের মা।
সোমবার ( ৯ ডিসেম্বর ) উপজেলা প্রশাসন ও মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের আয়োজনে উপজেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আড়ম্বরপূর্ণ এক অনুষ্ঠানে তার হাতে সম্মাননা স্মারক ও সনদ তুলে দেন মানিকগঞ্জ জেলার শিবালয় উপজেলার উপজেলা কর্মকর্তা মোঃ বেলাল হোসেন।
সন্তানকে সফল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার অন্যতম কারিগর হলেন মা। যে মায়ের সন্তানরা আজ প্রতিষ্ঠিত সেই মাকেই সমাজ সফল মা হিসেবে চিহ্নিত করেন। সমাজে সন্তানদের সুশিক্ষিত এবং আগামী দিনের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে ভোলার নিপুণ স্থপতি, সন্তানকে সত্যিকারের ও সফল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালনকারী সফল একজন মা হলেন মানিকগঞ্জ জেলার শিবালয় উপজেলার শিমুলিয়া ইউনিয়নের ছোট শাকরাইল গ্রামের আব্দুর রহমানের স্ত্রী রোকেয়া রহমান (৫৯)।
রোকেয়া রহমান ১৯৬৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর মানিকগঞ্জ জেলার নবগ্রাম ইউনিয়নের ধলাই গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। ছোটবেলায় বাবা মারা যাওয়ায় খুব বেশি পড়ালেখা করার সুযোগ পায়নি। মাত্র ১৬ বছর বয়সে নবম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় ১৯৮১ সালের ১১ জুন মানিকগঞ্জ জেলার শিবালয় উপজেলার ছোট শাকরাইল গ্রামের আব্দুর রহমানের সাথে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। নিজের পড়ালেখার প্রতি প্রবল অনুরাগ থেকে তিনি সন্তানদের পড়ালেখা করানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেন ও নিজের স্বপ্নপূরণ করার চেষ্টা করেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় সন্তানদের সর্বদা পড়ালেখায় উৎসাহ যুগিয়েছিলেন তিনি।
ব্যক্তি জীবনে রোকেয়া রহমান দুই কন্যা এবং দুই পুত্র সন্তানের জননী। বড় মেয়ে রোজিনা ৪০ নং দৌলতপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষিকা হিসেবে কর্মরত আছেন। ছোট মেয়ে ড. সুলতানা আক্তার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতক (সম্মান), স্নাতকোত্তর এবং পিএইচ.ডি ডিগ্রী লাভ করেন। বর্তমানে তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।
রোকেয়া রহমানের বড় ছেলে সেলিম মোল্লা মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার চরকাটারি ইউনিয়ন পরিষদের সচিব হিসেবে কর্মরত রয়েছেন এবং ছোট ছেলে ইসতিয়াক মাহমুদ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে কৃত্বিত্বের সাথে স্নাতক (সম্মান) (প্রথম শ্রেণি) ও স্নাতকোত্তর (প্রথম শ্রেণি) সম্পন্ন করে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি নুরুন্নাহার ট্রেডার্সে বিজনেস কোঅর্ডিনেটর হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।
সংসারে টানাপোড়েন, অর্থাভাবসহ নানা প্রতিকূলতার মাঝে কিভাবে ৪ সন্তানকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন জানতে চাইলে রোকেয়া রহমান দ্যা ডেইলি মিরর অফ বাংলাদেশকে জানান, 'খুব অল্প বয়সে আমার বিয়ে হয়ে যায়। স্বামীর সংসারে এসে নানা প্রতিকূলতা ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা দেখে খুবই চিন্তিত হতাম কিন্তু কখনো হতাশ হইনি। নিজেদের জমিতে কৃষি কাজের আয় দিয়ে অনেক কষ্টে সংসার পরিচালনা করেছি। সন্তানদের সব সময় বুঝিয়েছি শুধুমাত্র অর্থ উপার্জন করে প্রকৃত মানুষ হওয়া যায় না। লেখাপড়া হচ্ছে স্থায়ী সম্পদ। লেখাপড়া শিখে নিজে আলোকিত হয়ে সমাজকে আলোকিত করা যায়।'
সন্তানদের কাছে আপনার কী চাওয়া পাওয়া জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'আমি চাই সন্তানরা সমাজ ও দেশের কাজে এসে মানুষের কল্যাণে নিবেদিত থাকুক। নিজের আলোয় সমাজকে আলোকিত করুক। এছাড়া আমার সন্তানরা ও পুত্রবধূরা নিয়মিত আমাদের খোঁজখবর নেন। তারা সবসময় ভাল থাকুক এই কামনা করি।'
রোকেয়া রহমানের মতো এমন মহীয়সী নারী জন্মালে জন্ম নেবে এমন আলোকিত সন্তানরা। আর এই আলোকিত সন্তানরা সমাজ বিনির্মাণে ভূমিকা রাখবে। তাঁর এই দৃষ্টান্ত অন্য মায়েদের অনুপ্রাণিত করবে যুগে যুগে।
সোহাগ /মিরর





