‘আমার একটি মাত্র মেয়ে। বয়স পাঁচ বছর সাত মাস। প্রতিদিন ছোট্ট মেয়েটিকে বাসায় একা তালাবদ্ধ রেখে স্কুলে যেতে হয়। দেখাশোনার মতো বাসায় আর কেউ নেই। যত নিয়ম যেন শুধু চাকরিজীবী মায়েদের সন্তানদের জন্যই।’
পটুয়াখালীর বাউফলের দাসপাড়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক উম্মে হাফছা সুমার এমন একটি আবেগঘন ফেসবুক পোস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কর্মজীবী মায়েদের সন্তানদের নিরাপত্তা, কর্মক্ষেত্রে সহায়তা এবং ডে-কেয়ারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
শিক্ষক উম্মে হাফছা সুমা তার ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেন। পোস্টে তিনি জানান, মাত্র পাঁচ বছর বয়সী মেয়েকে প্রতিদিন বাসায় একা রেখে তাকে স্কুলে যেতে হয়। সন্তানকে দেখাশোনার মতো পরিবারের আর কেউ না থাকায় বাধ্য হয়েই এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে তাকে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উম্মে হাফছা সুমা বিদ্যালয় থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে নাজিরপুর বাংলাবাজার এলাকায় বসবাস করেন। তার স্বামী ঢাকায় চাকরি করেন। ফলে কর্মস্থলে যাওয়ার সময় ছোট মেয়েটির দেখাশোনার দায়িত্ব নেওয়ার মতো কেউ নিয়মিতভাবে পাশে থাকেন না।
শিক্ষক উম্মে হাফছা বলেন, ‘শুরুতে মেয়েকে মাঝেমধ্যে সাথে করে স্কুলে নিয়ে যেতেন। কিন্তু বিভিন্ন সমস্যার কারণে পরে সেটিও সম্ভব হয়নি। এরপর পরিচিতজনদের বাসায় মেয়েকে রেখে স্কুলে যেতাম।’
তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে শিশু নির্যাতনের বিভিন্ন ঘটনা সামনে আসায় কয়েকদিন ধরে মেয়েকে ঘরে রেখেই দরজায় তালা দিয়ে স্কুলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। মেয়েটি যে কক্ষে থাকে সেখানে একটি সিসি ক্যামেরা রয়েছে, যার সংযোগ তার মোবাইল ফোনের সাথেই যুক্ত। স্কুলে কাজের ফাঁকে মোবাইলের মাধ্যমে মেয়েকে দেখি এবং কথা বলি।’
নিজের এই পরিস্থিতির কথা তুলে ধরতেই তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্টটি করেছিলেন বলে জানান। তার আশা ছিল, বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে এলে কর্মজীবী মা ও শিশুর জন্য কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। তবে পরে নানা ধরনের মন্তব্য আসায় তিনি পোস্টটি সরিয়ে নেন।
এদিকে স্থানীয়রা বলছেন, একজন কর্মজীবী মাকে এভাবে ছোট শিশুকে একা রেখে কর্মস্থলে যেতে বাধ্য হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। পাঁচ বছরের একটি শিশুকে দীর্ঘ সময় একা ঘরে রাখা তার নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। একই সাথে এ ধরনের পরিস্থিতি কর্মজীবী মায়ের ওপর বাড়তি মানসিক চাপ তৈরি করে।
তাদের মতে, কর্মজীবী মায়েদের ছোট সন্তানদের নিরাপদে রাখার জন্য সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে ডে-কেয়ার সেন্টারের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি কর্মস্থলের সময়সূচিতে বাস্তবসম্মত নমনীয়তা আনার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।
এ বিষয়ে বাউফল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সালেহ আহমেদ বলেন, ‘বিষয়টি দুঃখজনক। তার জানা মতে উপজেলা বা জেলা পর্যায়ে সরকারি কোনো ডে-কেয়ার সেন্টার নেই। তবে ছোট সন্তান রয়েছে এমন কর্মজীবী মায়েদের জন্য ডে-কেয়ারের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।’
একজন মায়ের ব্যক্তিগত কষ্টের এই ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার পাশাপাশি কর্মজীবী নারীদের জন্য নিরাপদ শিশু পরিচর্যার ব্যবস্থা কতটা জরুরি, সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে।





