Thursday, 3 September 2026
শিরোনাম
এক্সক্লসিভ

শহীদ বুদ্ধিজীবী আব্দুল কাদের মিয়া: এক সংগ্রামী মুক্তিযোদ্ধার অমর কাহিনী

admin • 14 Dec 2024, 05:53 PM • পঠিত 2 বার
শেয়ার করুন:
শহীদ বুদ্ধিজীবী আব্দুল কাদের মিয়া: এক সংগ্রামী মুক্তিযোদ্ধার অমর কাহিনী

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে শহীদ বুদ্ধিজীবী আব্দুল কাদের মিয়ার নাম লেখা রয়েছে এক অবিনশ্বর অধ্যায়ে। তিনি ছিলেন একজন সাহসী পুলিশ কর্মকর্তা, যিনি মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্ন থেকেই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।

 

আবদুল কাদের মিয়ার জন্ম ১৯৩০ সালের ১ এপ্রিল সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার জামিরতা গ্রামে। বাবা কসিম উদ্দিন আহমেদ এবং মা আমেনা খাতুন। নয় সন্তানের জনক আব্দুল কাদের ছিলেন একজন আদর্শবান ব্যক্তি এবং কর্মক্ষেত্রে নিষ্ঠাবান।

 

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ২৭ মার্চ তিনি পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ থানায় বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত পতাকা উত্তোলন করেন। তিনি ঘোষণা দেন, “এখন থেকে দেবীগঞ্জ স্বাধীন।” এই ঘোষণার পর তিনি মুক্তিকামী যুবকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে থানার অস্ত্রশস্ত্র তাদের হাতে তুলে দেন এবং নিজেও যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন।

 

পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধযুদ্ধে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি অস্ত্র সংগ্রহের জন্য তিনি সীমান্ত পেরিয়ে হলদিবাড়ি যান। ৩১ মে পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে প্রতিরোধযোদ্ধাদের একটি সংঘর্ষে তিনি আহত হন। দল ছত্রভঙ্গ হলে তিনি আহত অবস্থায় নিজের বাড়িতে ফিরে আসেন। তার আহত হয়ে বাড়ি ফেরার খবর পেয়ে পাকিস্তান-সমর্থক শান্তি কমিটির লোকজন পাকিস্তানি সেনাদের খবর দেয়। ১ জুন সকালে সেনাবাহিনী তার বাড়িতে অভিযান চালায়। পরিবারকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে তিনি বাসায় গেলে সেনারা তাকে আটক করে। পরে দেবীগঞ্জের ব্রুজেরডাঙ্গা এলাকায় তাকে হত্যা করে এবং লাশ মাটিচাপা দেয়। স্বাধীনতার পর সেখানে তার জুতা, মোজা, আংটি এবং কলম পাওয়া যায়।

 

এ ঘটনাগুলোর বিবরণ পাওয়া যায় শহীদ বুদ্ধিজীবী আব্দুল কাদের মিয়ার কন্যা নূরজাহান বেগমের স্মৃতিকথা "আমার বাবা" রচনা থেকে।

 

নূরজাহান বেগম লিখেছেন, ‘আহত অবস্থায় পালিয়ে বহুকষ্টে বাবা আমাদের বাসার কাছাকাছি এক ভদ্রলোকের বাসায় আশ্রয় নেন। আমি তাঁর নাম জানি না। সেই হৃদয়বান ব্যক্তি নিজ হাতে রাতে বাবার ক্ষতস্থানগুলো গরম পানি, ডেটল দিয়ে পরিষ্কার করেন। একজন গ্রাম্য কবিরাজ ডেকে এনে কি কি লতাপাতা বেটে ক্ষতস্থানে প্রলেপ দিয়ে কাপড় দিয়ে বেঁধে দিয়েছিলেন। তারপর বাবার অনুরোধেই গভীর রাতে বাবাকে সাইকেলের সামনে বসিয়ে আমাদের কাছে পৌঁছে দেন। কে জানত এই আসাই বাবার শেষ আসা হবে!'

 

‘বাবাকে আহত অবস্থায় দেখে আমি চিৎকার করে কেঁদে উঠি। মা আমাকে ধমক দিয়ে চুপ করে দেন। ছোট ভাইবোনরা ঘুমিয়ে ছিল।

 

মাকে দেখে মনে হয়েছিল বাবা আসাতে তিনি মোটেই খুশি হননি। মা অস্থির হয়ে এক নিঃশ্বাসে বললেন, “তোমার এখানে না এলেই ভালো হতো। আমি না তোমাকে বারণ করে দিয়েছিলাম। এখন আর্মিরা যদি জেনে ফেলে তুমি এসেছ, তাহলে কি হবে বলো, তুমি চলে যাও, চলে যাও এখান থেকে।”

 

বাবা উত্তরে বললেন, “তোমরা যদি মরে যাও, আমার বেঁচে থেকে কি হবে। বরং চলো আমরা সবাই ভোরে অন্য কোথাও চলে যাই। মরলে সবাই একসঙ্গে মরব, বাঁচলে একসঙ্গে।”

 

মা বললেন, “আমাদের নিয়ে তোমার ভাবতে হবে না। তুমি মুক্তিযোদ্ধা। শত্রুরা জানতে পারলে তোমাকে বাঁচতে দিবে না।”

 

‘অসহ্য যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন বাবা। টুকটাক ওষুধ ও সান্ত্বনা ছাড়া আর কিছুই তখন ছিল না। ভোর না হতেই যমদূতের মতো তদানীন্তন পিস কমিটির সেক্রেটারি আরো ২-১ জনকে সঙ্গে করে এসে বাবাকে ডাক দেয়। ওরা খোঁজখবর নিয়েই এসেছে। তারপর সাড়ে আটটা-নয়টা হবে। আমি দরজা খুলে সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়েছি। বাইরে তাকিয়ে দেখি লোকজন দৌড়ে পালাচ্ছে। আমি চিৎকার দিয়ে জিজ্ঞেস করি, কি হয়েছে? একজন বলে, “মেলিটারি, মেলিটারি।” আমি দৌড়ে গিয়ে মাকে বলি, মা, মিলিটারি এসে গেছে।'

 

‘মা আমাকেসহ বড় মেয়েদেরকে বাসা ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যেতে বললেন। আমরা বাসা ছেড়ে অন্য একটা বাসায় গেলাম। পরে শুনেছি বাবা বহুকষ্টে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে আমার ক্লাসমেট ফারজিনাদের বাসা যান। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের বাসার সামনে আর্মিদের জিপ থামে। কিছুক্ষণ পর কে যেন বাবাকে মিথ্যা সংবাদ দেয়, “আপনার বৌ-ছেলেমেয়েদের আর্মিরা ধরে নিয়ে যাচ্ছে।” কোনো পুরুষ মানুষ এ সংবাদ শুনে চুপ থাকতে পারে না।

 

আমার যুদ্ধাহত বাবাও চুপ থাকতে পারেননি। তিনি তখন যান বাসায়। বাবাকে দেখতে পেয়েই হানাদার বাহিনী টেনেহিঁচড়ে তাঁকে নিয়ে যায়। সেদিন ছিল ১ জুন, রোজ মঙ্গলবার।’ (পরিমার্জিত। স্মৃতি: ১৯৭১, সপ্তম খণ্ড, সম্পাদনা রশীদ হায়দার, প্রকাশ ১৯৯৫)।

 

মহান মুক্তিযুদ্ধে আব্দুল কাদের মিয়ার অসামান্য অবদানের জন্য স্বাধীনতার পর ১৯৯৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার শহীদ বুদ্ধিজীবী হিসেবে তার স্মরণে দুই টাকার স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে। এছাড়া পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ উপজেলায় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পঞ্চগড় পুলিশ লাইনে একটি গ্রন্থাগার এবং একটি সড়ক তার নামে নামকরণ করা হয়।

 

এছাড়া প্রতিবছর স্বাধীনতা দিবস, বুদ্ধিজীবী দিবস এবং বিজয় দিবসে দেবীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শহীদ বুদ্ধিজীবী আব্দুল কাদের মিয়ার কবর জিয়ারত, পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়ে থাকে।

 

শহীদ আব্দুল কাদের মিয়ার আত্মত্যাগ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে অনন্য দৃষ্টান্ত। তার বীরত্ব, ত্যাগ এবং সাহসিকতা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়কে চিরজাগ্রত করে রেখেছে। তিনি শুধু একজন মুক্তিযোদ্ধা নন, তিনি আমাদের অনুপ্রেরণার প্রতীক।

মন্তব্য (0)

কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করুন

মন্তব্যটি অনুমোদনের পর প্রকাশিত হবে।