Thursday, 3 September 2026
শিরোনাম
এক্সক্লসিভ

রামিসা নজির হলে আছিয়ারা কেন বঞ্চিত?

admin • 09 Jun 2026, 07:23 PM • পঠিত 1 বার
শেয়ার করুন:
রামিসা নজির হলে আছিয়ারা কেন বঞ্চিত?
লক্ষ লক্ষ নারীর সম্ভ্রম আর চরম আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীন ভূখণ্ডে আজও নারীরা অনিরাপদ। অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে আমাদের স্বীকার করতে হয়—দেশ স্বাধীন হলেও নারীদের অবমাননা, পৈশাচিক সহিংসতা আর নির্মম হত্যাকাণ্ড আজও থেমে নেই। স্বাধীনতার এত বছর পরেও যেখানে নারীদের প্রতিনিয়ত বেঁচে থাকার লড়াই করতে হয়, তা একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে আমাদের সামষ্টিক বিবেককে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। এটি শুধু লজ্জাজনকই নয়, আমাদের জাতীয় অগ্রগতির বুকে এক বিরাট কলঙ্ক।   ইতিহাস সাক্ষী, নারীদের সম্ভ্রম ও রক্তের বিনিময়ে আমাদের এই স্বাধীনতা। কিন্তু আজ প্রশ্ন জাগে, সেই স্বাধীন দেশে নারীরা কতটা স্বাধীন? দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ অবধি নারী নির্যাতন, সহিংসতা এবং খুনের নৃশংসতা চলমান রয়েছে। একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে এর চেয়ে বড় ব্যর্থতা, লজ্জা এবং বেদনার কিছু হতে পারে না। এই অন্ধকার থেকে বের হতে না পারলে আমাদের স্বাধীনতার চেতনা অধরাই থেকে যাবে।   বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল ভিত্তি ছিল বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে মুক্তি। নারী সমাজ তাদের সর্বোচ্চ ত্যাগের মাধ্যমে এই স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। তবে নির্মম সত্য এই, স্বাধীনতার পর থেকে আজ অবধি নারী নির্যাতন ও সহিংসতা এক ধারাবাহিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। এই চলমান অবমাননা ও হত্যাকাণ্ড একটি স্বাধীন ও সভ্য জাতির জন্য চরম লজ্জাজনক এবং গভীর বেদনার। এটি প্রমাণ করে, কাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে আমরা প্রকৃত মুক্তি অর্জন করতে পারিনি।   বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ এবং নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচারপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে একটি তীব্র বৈপরীত্য আমাদের থমকে দেয়। ঢাকার মিরপুরে ৭ বছরের শিশু রামিসা আক্তার হত্যাকাণ্ডের বিচার যেভাবে মাত্র এক মাসের বিশেষ তৎপরতায় সম্পন্ন করার নজির সৃষ্টি করা হয়েছে, তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিচার বিভাগের সদিচ্ছার এক অনন্য উদাহরণ। কিন্তু একই দেশে, একই আইনের অধীনে মাগুরার ৮ বছরের শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যার রায় হওয়ার পর কেন উচ্চ আদালতের লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে মামলা ঝুলে থাকবে? এই প্রশ্নটি আজ দেশের প্রতিটি বিবেকবান মানুষকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।   মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (ASK) এবং অন্যান্য সংগঠনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিগত ২০২৫ সাল থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত বাংলাদেশে ১,৮৯০ জনেরও বেশি নারী, শিশু ও কিশোরী মারাত্মক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে কেবল নির্দিষ্ট কিছু সময়ে গড়ে প্রতি ৩০ ঘণ্টায় একটি করে শিশু ধর্ষণের শিকার হওয়ার মতো ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, ধর্ষণ বা শারীরিক নির্যাতনের পর প্রমাণ মুছে ফেলতে নির্মমভাবে হত্যার শিকার হয়েছে অসংখ্য ভুক্তভোগী। অথচ, দেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোতে বর্তমানে পৌনে দুই লাখের বেশি মামলা ঝুলে আছে, যার মধ্যে ৩৫ হাজারেরও বেশি মামলা ৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে সম্পূর্ণ অনিষ্পন্ন!   আমরা এই পৈশাচিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর বিচার নিশ্চিত দেখতে চাই। একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে এটিই আজ আমাদের সকলের একমাত্র প্রত্যাশা।   রামিসা মামলার দ্রুত রায় প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র এবং প্রশাসনের সদিচ্ছা থাকলে আইনের সমস্ত বেড়াজাল ভেঙে দ্রুততম সময়ে অপরাধীকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো সম্ভব। কিন্তু বিচার ব্যবস্থার এই বিশেষ তৎপরতা কেন কেবল দু-একটি বহুল আলোচিত বা চাঞ্চল্যকর মামলার ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে?   সাধারণ নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান আছিয়া কিংবা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের নাম না-জানা শত শত নির্যাতিতা কেন দ্রুত বিচার পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে?   আছিয়া হত্যা মামলায় নিম্ন আদালত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিলেও, সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে ‘ডেথ রেফারেন্স’ (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) ও আসামিপক্ষের আপিল জটে বছরের পর বছর তা শুনানির অপেক্ষায় পড়ে থাকে। একটি মাত্র দ্রুত বিচার আমাদের ক্ষণিকের স্বস্তি দেয়, কিন্তু বিচার ব্যবস্থার সার্বিক এই স্থবিরতা ও মাত্র ৩ শতাংশের নিচে থাকা নামমাত্র দণ্ডাদেশের হার সমাজে ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’কে আরও জেঁকে বসতে সাহায্য করছে।   যদিও দেশের এই জরুরি পরিস্থিতি বিবেচনায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনকে ২০২৬ সালে আবারও সংশোধন করা হয়েছে এবং সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি নারী ও শিশু নির্যাতন-সংক্রান্ত ডেথ রেফারেন্স নিষ্পত্তির জন্য হাইকোর্টে বিশেষ বেঞ্চ গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন, কিন্তু মাঠপর্যায়ে এর সুফল এখনো মেলেনি। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বিজি প্রেস থেকে মামলার বিবরণী বা ‘পেপারবুক’ তৈরি হতেই কয়েক বছর সময় চলে যাচ্ছে।   নারী ও শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে হলে প্রতিটি মামলাকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। তদন্ত ও বিচারের আইনি সময়সীমা কেবল কাগজে নয়, বাস্তবে প্রয়োগ করতে হবে। জনমানুষের স্পষ্ট প্রত্যাশা—বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ‘ভিআইপি কালচার’ থাকতে পারে না; রামিসার পরিবার যেভাবে দ্রুত বিচার পেয়েছে, দেশের প্রতিটি প্রান্তের আছিয়াদের পরিবারও যেন ঠিক একই গতিতে সমঅধিকারের বিচার পায়।   একটি দেশের সভ্যতা কখনোই তার সুরম্য দালানকোঠা, চোখধাঁধানো অবকাঠামো কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সূচকের ওপর নির্ভর করে না। ইতিহাস সাক্ষী, মানুষের তৈরি এসব বাহ্যিক জৌলুস ও ইট-পাথরের উন্নয়ন চিরকাল টিকে থাকে না। সময়ের বিবর্তনে তা ধূলিসাৎ হয়ে যায়। একটি রাষ্ট্র বা সমাজ তখনই টিকে থাকে এবং সভ্য বলে গণ্য হয়, যখন সেখানে প্রতিটি মানুষ, বিশেষ করে নারী ও শিশুরা পুরোপুরি নিরাপদ ও নির্ভয়ে বেঁচে থাকার গ্যারান্টি পায়।   দেশে কঠোর আইন (যেমন—ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড) থাকা সত্ত্বেও অপরাধীদের আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বের হয়ে যাওয়ার প্রবণতা সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, প্রায় ৮৫ শতাংশ ক্ষেত্রেই শিশুরা তাদের পরিচিত বা নিকটাত্মীয়দের দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। তাই সামাজিক সচেতনতা এবং পারিবারিক নজরদারি বাড়ানো জরুরি।   দীর্ঘসূত্রিতার কারণে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো অনেক সময় মামলার আশা ছেড়ে দেয় বা আপস করতে বাধ্য হয়। বিচার প্রক্রিয়াকে গতিশীল করতে ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়ানো এবং সাক্ষীদের দ্রুত আদালতে হাজির করা প্রয়োজন।   নারী ও শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে হলে প্রতিটি মামলাকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। প্রচলিত আইনের তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘ সময়সীমা অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করতে তদন্ত ১০ দিন এবং বিচার প্রক্রিয়া সর্বোচ্চ ১ মাসের মধ্যে সম্পন্ন করার আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করা প্রয়োজন। এর জন্য মেডিকেল ও ফরেনসিক রিপোর্ট ১০ দিনের মধ্যে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা, বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত আসামির জামিন সম্পূর্ণ স্থগিত রাখা এবং বিরতিহীনভাবে প্রতিদিন (Day-to-Day) আদালত চালানো জরুরি। একই সঙ্গে সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি কার্যকর ‘সাক্ষী সুরক্ষা আইন’ প্রণয়ন করতে হবে।   নতুন সরকারের নীতিনির্ধারকদের উচিত—অবিলম্বে এই কঠোর সময়সীমা ও সংস্কারগুলো যুক্ত করে আইন সংশোধনের বিল পাস করা। আইন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে, এর বাস্তব প্রয়োগ ও দ্রুততম সময়ে রায় বাস্তবায়নই এখন সময়ের দাবি। নবগঠিত এই সংসদ ও রাষ্ট্র কি পারবে যুগান্তকারী আইনি সংস্কারের মাধ্যমে জনগণের তীব্র আকুলতা আর হারানো আস্থা ফিরিয়ে দিতে?   আমরা সবাই এই পৈশাচিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে দ্রুত এবং দৃষ্টান্তমূলক বিচার দেখতে চাই। একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে আজ আমাদের সকলের প্রত্যাশা এটিই। নারী ও শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে হলে প্রতিটি মামলাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে।   রাষ্ট্র যদি প্রতিটি নির্যাতিতার ক্ষেত্রে ‘রামিসা মডেল’-এর মতো দ্রুততম সময়ে অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে পারে, তবেই ভুক্তভোগীদের চোখের জল মুছবে এবং আইন ও বিচার ব্যবস্থার ওপর দেশের সাধারণ মানুষের হারিয়ে যাওয়া আস্থা ও স্বস্তি চিরতরে ফিরে আসবে। অন্যথায়, এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি আমাদের দৃশ্যমান সমস্ত অর্থনৈতিক উন্নয়নকে অর্থহীন করে দেবে। একটি ধর্ষকমুক্ত, নিরাপদ সমাজ এবং আইনের নিখাদ সুশাসনই আজ রাষ্ট্রের কাছে এ দেশের সাধারণ মানুষের জোর দাবি।   লেখক : নাট্যকার ও প্রাবন্ধিক
মন্তব্য (0)

কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করুন

মন্তব্যটি অনুমোদনের পর প্রকাশিত হবে।