Friday, 4 September 2026
শিরোনাম
এক্সক্লসিভ

বাঙ্গালী পুনর্বাসনই উপজাতিদের হিংসাত্মক আচরণের মূল কারণ নয়,নেপথ্যে কী..?

admin • 30 Mar 2026, 02:12 PM • পঠিত 2 বার
শেয়ার করুন:
বাঙ্গালী পুনর্বাসনই উপজাতিদের হিংসাত্মক আচরণের মূল কারণ নয়,নেপথ্যে কী..?

পার্বত্য অঞ্চলের উপজাতীয় আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে বেশ কিছু পরস্পরবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি পরিলক্ষিত হয়। একদল মনে করেন, এই আন্দোলনের একমাত্র লক্ষ্য হলো স্বায়ত্তশাসন লাভ। অন্য এক পক্ষ আবার একে স্রেফ একটি মুখোশ হিসেবে গণ্য করেন; তাঁদের মতে, এর আড়ালে মূল উদ্দেশ্য হলো পূর্ণ স্বাধীনতা এবং এই প্রক্রিয়ায় ভারতকে একটি তাবেদার রাষ্ট্র গঠনের নেপথ্য কারিগর হিসেবে সন্দেহ করা হয়। আবার মধ্যপন্থীদের দৃষ্টিতে, এখানে বিচ্ছিন্নতা বা স্বায়ত্তশাসন মুখ্য নয়, বরং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতর থেকে সর্বাধিক সুযোগ-সুবিধা আদায়ই আসল উদ্দেশ্য। এই বিভিন্নধর্মী মূল্যায়নের যথার্থতা যাচাই করতে হলে এই অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক বিবর্তন এবং লিখিত রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে।

 

পাকিস্তান আমলে এই অঞ্চলের প্রধান সমস্যা ছিল চরম পশ্চাদপদতা। জুম চাষ ও বনজ সম্পদ আহরণ ছিল জীবনধারণের প্রধান অবলম্বন, আর শাসনব্যবস্থা ছিল আমলাতান্ত্রিক ও সামন্ততান্ত্রিক। দারিদ্র্য ও অরাজকতা মানুষকে এক প্রকার অসহায় করে রেখেছিল। তবে পরিবর্তনের সূচনা ঘটে ষাটের দশকে কর্ণফুলী হ্রদ সৃষ্টির মাধ্যমে। বাঁধের কারণে জমিজমা ও ঘরবাড়ি হারানোর বিপরীতে যখন বড় অংকের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হলো, তখন এই জনপদ প্রথমবারের মতো বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থের স্পর্শ পায়। এই সচ্ছলতা একদিকে যেমন উল্লাস বয়ে আনে, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার কারণে বর্ধিত ক্ষতিপূরণ ও সুষ্ঠু পুনর্বাসনের দাবিকেও জোরালো করে তোলে। সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে মনোনিবেশ করে।

 

উন্নয়ন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পাড়ায় পাড়ায় প্রাথমিক বিদ্যালয় ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে ওঠে। এক সময় যে অঞ্চলে শিক্ষা ছিল দুর্লভ, সেখানে হঠাৎ শিক্ষা ও আধুনিকতার জোয়ার আসে। নগদ অর্থের প্রবাহে মানুষের জীবনযাত্রায় আধুনিকতার ছাপ পড়ে এবং বনজ জীবন ছেড়ে তারা শহুরে সাজ-পোশাকে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। এই সচ্ছলতা স্থানীয়দের মাঝে উচ্চশিক্ষা ও হীনম্মন্যতাহীন এক নতুন জীবনবোধের জন্ম দেয়। পাকিস্তানের শেষ দিকে স্থানীয় শাসনের বিভিন্ন পদে রাজনৈতিক পুনর্বাসন এবং শিল্প-কারখানায় কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু শিক্ষার হার বাড়ার সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও কর্মসংস্থানের চাহিদা। মূলত এই বর্ধিত চাহিদাই নতুন এক রাজনৈতিক আন্দোলনের বীজ বপন করে, যেখান থেকে উচ্চারিত হয় স্বায়ত্তশাসন ও উপজাতীয় স্বাতন্ত্র্য রক্ষার দাবি।

 

এই বিক্ষুব্ধ প্রজন্মের নেতা হিসেবে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার উত্থান ঘটে। তাঁর দেওয়া স্লোগানগুলো পাহাড়ে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে, যার প্রতিফলন দেখা যায় ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তাঁর বিপুল বিজয়ে। এই জয় উপজাতীয় স্বাতন্ত্র্য প্রীতি ও স্থানীয় আধিপত্য লাভের আকাঙ্ক্ষাকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। তবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে এই প্রক্রিয়ায় কিছুটা স্থবিরতা আসে। এই অন্তর্বর্তীকালেই তারা মিজো স্বাধীনতাকামী ও স্থানীয় রাজাকারদের সংস্পর্শে এসে সশস্ত্র আন্দোলনের কৌশল সম্পর্কে ধারণা লাভ করে।

 

মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের পরাজয় নিশ্চিত হওয়ার পর দিশেহারা মিজো ও রাজাকাররা যখন কোণঠাসা, তখন লারমা ও তাঁর সহযোগীরা তাদের সীমান্ত সংলগ্ন রাইংখ্যং এলাকায় আশ্রয়ের সুযোগ করে দেন। দুর্গম এই অঞ্চলে বসবাসকারী জুমিয়ারা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে এই বাহিনীকে রসদ জোগাতে শুরু করে। পরবর্তীতে ভারতীয় বাহিনীর চাপে মিজোরা মিয়ানমার সীমান্তের দিকে সরে গেলেও উপজাতীয় রাজাকাররা লারমার তত্ত্বাবধানে সেখানেই থেকে যায়। এরপর পাকিস্তানিদের ফেলে যাওয়া অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ এবং নতুন নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শক্তি বৃদ্ধি করা হয়। এই সশস্ত্র বাহিনীটিই শেষ পর্যন্ত 'শান্তিবাহিনী' নামে আত্মপ্রকাশ করে এবং ১৯৭২ সালে এর রাজনৈতিক শাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় 'জনসংহতি সমিতি'। এভাবেই একটি আর্থ-সামাজিক দাবি ক্রমান্বয়ে সশস্ত্র রাজনৈতিক রূপ লাভ করে।

 

পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে জেএসএস (শান্তিবাহিনী) এর উথান শুরু হয়ে যায় বাঙালি হত্যা/গণহত্যা, চাঁদাবাজি, সেনা পেট্রোলে এম্বুসে হামলা, অপরহণের মাধ্যমে। তারা প্রস্ততি নিতে থাকে সামরিক পোশাক,ওয়াকিটকি,অস্ত্র প্রশিক্ষণ এবং গেরিলা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে। পাহাড়ের নিরীয় সহজ-সরল উপজাতি যুবকদের অর্থ ও অস্ত্রের মুখে জোর পূর্বক বাহিনীতে জোগদান করানো হয়। লংগদু, ভূষণছড়া, নানিয়ারচর সহ দশের অধিক স্থানে বাঙালিদের উপর গণহত্যা চালায় পিসিজেএসএস (শান্তিবাহিনী)। তৎকালিন বাংলাদেশ সরকার শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ঘটনার গুরুত্ব বুঝতে পারেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিদ্রোহ দমনে তিনি বিদ্রোহীদের সাথে আলোচনা ও শান্তি স্থাপনার লক্ষে বৈঠকের আহবান জানান। রাঙামাটি সার্কিট হাউসে বৈঠকের আয়োজন করা হয়। সেই বৈঠকে তারা নিম্নোক্ত লিখিত বক্তব্য পেশ করেন।

 

১। "আমার মাতৃস্তন্য কাহাকেও ধরিতে দিতে আমার ইচ্ছা নাই।"

২। বে-আইনী বাঙ্গালী অনুপ্রবেশকারীদের স্রোতধারা অবিলম্বে ও নিশ্চিত রূপে বন্ধ করিতে হইবে।"

৩। "উপযুক্ত তদন্ত পূর্বক এ যাবৎকাল পর্যন্ত বেআইনীভাবে বন্দোবস্তিকৃত, হস্তান্তরিত এবং দখলিকৃত জমি হইতে বহিরাগতগণকে উচ্ছেদ করিতে হইবে।”

৪। "চির প্রচলিত পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি প্রশাসন সম্মন্ধীয় বিধি এবং উপবিধি সমূহ কার্যকরীভাবে প্রয়োগ করিতে হইবে।"

 

উক্ত দাবি-দাওয়াতে পিসিজেএসএস(শান্তিবাহিনী) এর উগ্রতা ও হিংস্রতা প্রকাশ পায়। যা একটি স্বাধীন সার্বভৌমত্ব দেশের জন্য মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। পরবর্তীতে গুরুত্ব বিবেচনা করে সেনাক্যাম্প বৃদ্ধি করে সরকার। জনাব 'জিয়াউর রহমান ইহাকে উপজাতীয় বাড়াবাড়ি জ্ঞান করে সিদ্ধান্ত নেনঃ তাদের আপত্তিকৃত বাঙ্গালী সংখ্যা বৃদ্ধির দ্বারাই উপজাতীয় প্রাধান্যের বিপদের মোকাবেলা করা সঠিক হবে। সংখ্যা প্রাধান্যের বলেই উপজাতিরা উগ্র ও দুর্বিনীত। ইহার স্থায়ী সমাধানই হলো; বাঙ্গালীর সংখ্যা বৃদ্ধি। সংখ্যা লঘু না হওয়া পর্যন্ত তারা দমবে না। ইহার পাশাপাশি যোগাযোগ সহ প্রতিটি ক্ষেত্রে উন্নয়ন কাজও দরকার। প্রতিরক্ষা মুলক প্রস্তুতি চালাতে হবে। সুতরাং শুরু হয়ে যায় বাঙ্গালী পুনর্বাসন। সেনা ছাউনী বৃদ্ধির প্রতি জোর দেওয়া হয়। পার্বত্ য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড প্রতিষ্ঠা লাভ করে। যোগাযোগ ব্যবস্থার দ্রুত উন্নয়নে অধিক মনোযোগঘটে।

 

অতীত অভিজ্ঞতার অভাবে অনেকেই মনে করেন; বাঙ্গালী পুনর্বাসনই উপজাতিদের হিংসাত্মক আচরণের মূল কারণ। কিন্তু ঐ প্রতিবাদীরা জানেন না যে, ওদের অনেকের বাঙ্গালী বিদ্বেষ একটি দীর্ঘ লালিত স্বভাব। উপরোক্ত স্মারক লিপির প্রথম দফা গুলি ইহার প্রমান। বাঙ্গালী পুনর্বাসন ইহার পরের ঘটনা। অপ্রিয় হলেও বাঙ্গালী পুনর্বাসন কাজটি রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষার অপরিহার্য অংশ। স্থানীয় বিদ্বিষ্ট জনগোষ্ঠীকে সংখ্যালঘু করার মাধ্যমেই এতদাঞ্চলের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত হতে পারে। নতুবা ইহা হয়ে থাকবে তাদের রাজনৈতিক উচ্চাশা পুরণের ঘাটি। সংখ্যাগত প্রাধান্যের মাধ্যমে প্রাপ্য আধিপত্য লাগামহীন উচ্চাকাঙ্খা পুরণের কারণ হতে পারে। যার দ্বারা আনুগত্য-হীনতা ও বিদ্রোহ ঘটা সম্ভব। সন্দেহ ভাজনদের সংখ্যা লঘুতে পরিণত করার অর্থ তাদের প্রতি অত্যাচার করা নয়।

 

জাতি ও দেশের কল্যাণে এটা তাদের ত্যাগ ও ক্ষতি স্বীকার। দেশ রক্ষায় প্রাণ দিতে হয়। জাতীয় সম্মান রক্ষায় অনেক কিছু হারাতে হয়। সেটা আত্মদান ও স্বার্থ ত্যাগের মহৎ দৃষ্টান্ত। তাতে ক্ষতি আর পীড়ণ থাকলেও তৃপ্তি দায়ক অহংকারও নিহিত। উপজাতিদের সংখ্যালঘুতে পরিনত হওয়া এমনি এক মাহাত্ম্য মন্ডিত কাজ। জাতি ও দেশের পক্ষে এটা প্রয়োজনীয়। এই অপ্রিয় কাজ স্বেচ্ছায় অনুষ্ঠিত হওয়া সম্ভব নয়। এক শক্তিশালী পক্ষ ইহার বিরোধিতা করবেই।

মন্তব্য (0)

কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করুন

মন্তব্যটি অনুমোদনের পর প্রকাশিত হবে।