স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নানা ধরনের ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা সম্পূর্ণভাবে দূর হয়নি। বিশেষ করে দেশের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্ন, উদ্বেগ ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত আলোচনার জন্ম হয়েছে। পার্বত্য অঞ্চলে সক্রিয় সশস্ত্র আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর কার্যক্রম, সীমান্তপারের যোগাযোগ, অস্ত্র ও রসদ সরবরাহের অভিযোগ এবং বিদেশি ভূখণ্ডে চিকিৎসা ও আশ্রয়ের বিষয়গুলো নতুন করে জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
বিগত সময় রাঙামাটির দুর্গম যমচুগ ও মারিচুগ মৌন এলাকায় সেনাবাহিনীর অভিযানে উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন সামগ্রী ও আলামতকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনায় এসেছে পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র রাজনীতি। উদ্ধারকৃত কিছু সামরিক পোশাক, চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথিপত্র এবং গোলাবারুদের খোসা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে এগুলো কি কেবল একটি অভ্যন্তরীণ সংঘাতের চিত্র, নাকি এর পেছনে সীমান্তপারের কোনো প্রভাব বা সহায়তা কাজ করছে? অভিযানে উদ্ধার হওয়া কিছু পোশাকে ভারতীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাপড়ের লেবেল পাওয়া যাওয়ার বিষয়টি আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অভিযানে উদ্ধার হওয়া একটি ইউনিফর্মের অভ্যন্তরে “SCHOOL TIME – KANCHAN” লেখা কাপড়ের চিহ্ন দেখা যায়, যা ভারতীয় বাজারে ব্যবহৃত একটি বাণিজ্যিক টেক্সটাইল ব্র্যান্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে দাবি করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে সংঘাতস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া একটি চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্রে ভারতের মিজোরাম রাজ্যের একটি হাসপাতালের নাম উল্লেখ থাকায় অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, আহত সশস্ত্র সদস্যরা কি সীমান্ত অতিক্রম করে চিকিৎসা সুবিধা গ্রহণ করছে? যদিও এসব বিষয় নিয়ে তদন্ত ও যাচাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তথাপি ঘটনাগুলো জাতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এবং অবাধে সীমান্ত পারি দিয়ে সেখানে বিভিন্ন সহায়তার কথা অনেক আগ থেকেই আলোচনায় এসেছে।
আবার সেখানে বিভিন্ন সন্ত্রাসী ঘাটির সত্যতাও মিলেছে আগে। আর কল্পনা চাকমার বাসস্থান সেখানে সেটা আরো স্পষ্ট হয়েছে অনেক আগেই। সব মিলি তাদের নিরাপদ আবাসস্থল এখন ভারতের বিভিন্ন স্থানে রয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে রাঙামাটির বন্দুকভাঙা রেঞ্জের যমচুগ ও মারিচুগ এলাকায় জেএসএস ও ইউপিডিএফের মধ্যে সংঘর্ষের খবর প্রকাশিত হয়। সংঘর্ষের পর সেনাবাহিনীর বিশেষ অভিযানে বিভিন্ন ক্যালিবারের শত শত গুলির খোসা এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনা প্রমাণ করে যে পার্বত্য চুক্তির প্রায় তিন দশক পরও পার্বত্য অঞ্চলে অস্ত্রনির্ভর আধিপত্য বিস্তারের রাজনীতি পুরোপুরি শেষ হয়নি।
পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত এই অঞ্চল একদিকে ভারত, অন্যদিকে মিয়ানমারের নিকটবর্তী হওয়ায় এটি দীর্ঘদিন ধরেই আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে এখানে সংঘাত, অস্থিতিশীলতা কিংবা বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতা কেবল স্থানীয় সমস্যা নয়; বরং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সীমান্তের দুর্গমতা এবং পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন অবৈধ নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকতে পারে। অস্ত্র, রসদ, চিকিৎসা সুবিধা কিংবা সদস্যদের যাতায়াতের অভিযোগগুলো তাই গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। কারণ একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ভেতরে সশস্ত্র তৎপরতার টিকে থাকা কখনোই স্বাভাবিক বিষয় নয়।
সাম্প্রতিক সময়ে সন্তু লারমার ভারত সফর নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন পর্যবেক্ষক ও সমালোচকদের মতে, পার্বত্য অঞ্চলে সশস্ত্র তৎপরতা, সীমান্তপারের যোগাযোগ এবং উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন আলামতের প্রেক্ষাপটে তাঁর এই সফরের উদ্দেশ্য নিয়ে জনমনে কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে। তাদের দাবি, ভারত সফরকালে তিনি বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করে সংগঠনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে মতবিনিময় ও সাংগঠনিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। যদিও এসব বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়নি, তবুও বিগত সময়ের ঘটনাপ্রবাহের আলোকে বিষয়টি নিয়ে নানা মহলে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের চলমান পরিস্থিতি এবং সীমান্তপারের যোগাযোগের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে তাঁর ভারত সফরের তাৎপর্য নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
স্বাধীন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের ষড়যন্ত্র তা অভ্যন্তরীণ হোক বা সীমান্তপারের প্রভাব দ্বারা উৎসাহিত হোক রাষ্ট্রের জন্য সমানভাবে উদ্বেগের বিষয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষ শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন চাইলেও সশস্ত্র সংঘাত, চাঁদাবাজি এবং আধিপত্য বিস্তারের রাজনীতি সেই শান্তির পথে বড় বাধা হয়ে রয়েছে। আজ সময় এসেছে দেশবাসীর আরও সজাগ হওয়ার। জাতীয় ঐক্য, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করা, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং যেকোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করাই হতে পারে স্থায়ী শান্তির পূর্বশর্ত।
একই সঙ্গে পার্বত্য অঞ্চলের সকল সম্প্রদায়ের ন্যায়সঙ্গত উন্নয়ন ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো গোষ্ঠী বিদেশি প্রভাব বা সহিংসতার পথকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপসের সুযোগ নেই। দেশের অখণ্ডতা রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের যেমন, তেমনি সচেতন নাগরিকদেরও। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামকে ঘিরে উদ্ভূত প্রতিটি অভিযোগ, প্রতিটি আলামত এবং প্রতিটি নিরাপত্তা-ঝুঁকিকে গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করে সত্য উদঘাটন এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে যাওয়াই সময়ের দাবি।





