Friday, 4 September 2026
শিরোনাম
এক্সক্লসিভ জেলার খবর

'আমাদের জীবনটা অনেক কষ্টের জীবন,ছেলেমেয়ে থেকেও নেই'

admin • 23 Mar 2024, 04:24 PM • পঠিত 2 বার
শেয়ার করুন:
'আমাদের জীবনটা অনেক কষ্টের জীবন,ছেলেমেয়ে থেকেও নেই'

জেলা প্রতিনিধি, কুষ্টিয়া:

'আমার জীবন খুব কষ্টের। আমি বাসাবাড়ি ও রাস্তার কাজ করে ছেলেমেয়েকে মানুষ করেছি। আমার ছেলেমেয়ে, ভাইবোন, আত্মীয়স্বজন সবাই-ই আছে। আমি বৃদ্ধা হয়ে গেছি, কাজ করতে পারি না। আমাকে কেউ দেখাশোনা করে না। এজন্য গত ৫ বছর ধরে বৃদ্ধাশ্রমে থাকি।

বৃদ্ধাশ্রমের জীবনও অনেক কষ্টের। টাকাপয়সার অভাবে ইফতারের জিনিসপত্র কিনতে পারে না। অনেক সময় খাদ্য খাবারও কিনতে পারে না। ঘরের টিন ফুটো হয়ে গেছে। বৃষ্টি হলে ঘরের মধ্যে পানি চলে আসে। আমাদের কাপড়, ঔষধ, ইফতারের কষ্ট। সবকিছুরই কষ্ট। আমরা চলতে পারছি না। টাকার অভাবে ইফতার কিনতে পারছে না, ভাত দিয়ে ইফতার করতে হচ্ছে৷ অর্থের অভাবে আমাদের খুব কষ্ট হয়, সকলের সাহায্য চাই। আমার ছেলের বাড়ি কুষ্টিয়া সদর উপজেলার বটতৈল এলাকায়।' কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলছিলেন বৃদ্ধা আমেনা বেগম।

ষাটোর্ধ্ব বয়সী সাজেদা খাতুন বলেন, ছেলেমেয়ে আছে। তাদেরকে কষ্ট করে কোলেপিঠে করে মানুষ করেছি। এখন তারা, যার যার মতো সে সে। যার যার কর্ম সে সে করছে। তারা তাদের ছেলেপিলে নিয়ে করে খাচ্ছে। আমি এখন বুড়োকালে বৃদ্ধাশ্রমে থাকি। আমাদের জীবনটা অনেক কষ্টের জীবন। ছেলেমেয়ে থেকেও নেই। আগেকার জীবনের কথা বলতে গেলে কষ্ট বেড়ে যায়। সেসব কথা বলতে চাই না।

ষাটোর্ধ্ব বয়সী বৃদ্ধা সাজেদা খাতুন ও আমেনা বেগম থাকেন কুষ্টিয়া শহরের পূর্ব মজমপুর এলাকার উদয় মা ও শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে। অভাবী, অসহায়-দুস্থ ও স্বামী-সন্তানহারা বৃদ্ধ মায়েদের জন্য ১৯৯৯ সালে এই প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে সেখানে আমেনা বেগমের মতো জীবনের পড়ন্ত বেলায় অসহায় বৃদ্ধা ২৭ জন মা থাকেন। এসব অসহায় মায়েদের খাবার, চিকিৎসাসেবা, ওষুধ, পোশাক-পরিচ্ছদসহ নানা সুযোগ-সুবিধা দেয়ার চেষ্টা করে পুনর্বাসন কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ। তবে আর্থিক অভাবের কারণে প্রয়োজনীয় খাবার, পোশাক সহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার যথাযথ ব্যবস্থা করতে পারেনা তারা। বিত্তবানদের কাছে সহযোগিতার অনুরোধ জানিয়েছেন তারা৷

সরেজমিনে ইফতারের ১৫ মিনিট আগে উদয় মা ও শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, বয়স্ক মায়েরা কেউ ওজু করছেন, কেউবা বসে দোয়া-দরুদ পড়ছেন। আছেন পুনর্বাসন কেন্দ্রটিতে আশ্রিতরা কেউ ঘুমাচ্ছেন, কেউবা নামাজ পড়ছেন। কেউবা চুপচাপ ইফতার করার জন্য বসে আছেন। সবার চোখেমুখে না পাওয়ার কষ্টের ছাপ। রোজাদার বৃদ্ধা অসহায় মায়েদের জন্য থালায় ভাত তুলে দেয়া হচ্ছে। মসজিদের মাইকে ইফতারের ঘোষণার সাথে সাথে চিনির শরবত দিয়ে ইফতার শুরু করেন। এরপর ভাত খাওয়া শুরু করে তারা। অর্থের অভাবে ইফতার সামগ্রী কিনতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। এজন্য ভাত দিয়ে একবারে রাতের খাবার ও ইফতার সম্পন্ন করেন বলে জানিয়েছেন ভাগ্যতাড়িত অসহায় মায়েরা ও কর্তৃপক্ষ।

নসিরন খাতুন বলেন, আমার দুইটা মেয়ে হয়েছিলো। তাদের ছোট রেখে আমার স্বামী মারা গেছে। আমি অফিসারদের বাসায় কাজ করতাম। কাঁথা সেলাই করতাম। এভাবে অনেক কষ্টে মেয়ে দুটিকে বড় করেছি। তাদের বিয়ে হয়ে গেছে। আমার তো ছেলে সন্তান নাই। এজন্য ২০ বছর ধরে বৃদ্ধাশ্রমে থাকি। বৃদ্ধাশ্রমে টাকার অভাবে ইফতার কিনতে পারে না। এজন্য আমরা ভাত খেয়ে ইফতার করি। টাকার অভাবে ইফতার কিনতে পারছি না। এছাড়াও টাকার অভাবে থাকা, খাওয়া, কাপড়চোপড় ও চিকিৎসার কষ্টে আছি। আমাদের সবাই সহযোগিতা করেন।

সত্তরোর্ধ্ব বয়সী আয়েশা খাতুন বলেন, আমি নিঃসন্তান। আমার ছেলেমেয়ে নাই। ঘরবাড়ি নাই, থাকার জায়গা নাই। আমার ভাইবোন আত্মীয় স্বজন আছে। তারা আমার দেখাশোনা করে না। ১০ বছর ধরে বৃদ্ধাশ্রমে রয়েছি। মরণের আগ পর্যন্ত এখানেই থেকে যাবো। অর্থের অভাবে আমাদের অন্নবস্ত্রের কষ্ট হয়। টাকার অভাবে ইফতার কিনতে পারে না। আমরা ভাত দিয়ে ইফতার করি। আপনারা আমাদের সাহায্য করুন।

আনজিরা খাতুন বলেন, আমার ছেলেমেয়ে আছে, তারা দেখাশোনা করে না। আমি ৫ বছর ধরে বৃদ্ধাশ্রমে আছি। টাকার অভাবে ইফতার কিনতে পারিনা, ভাত দিয়ে ইফতার করি। আমি অনেক আগে থেকে অসুস্থ। হার্টের অসুখ, টাকার জন্য চিকিৎসা করাতে পারিনা। সবার কাছে সাহায্যের আবেদন জানাচ্ছি। যে যা পারেন, আমাদের সহযোগিতা করুন। অর্থের অভাবে আমরা অনেক কষ্টে আছি।

উদয় মা ও শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক আফরোজা ইসলাম বলেন, প্রায় ২২ বছর ধরে নির্যাতিত, নিপিড়ীত, বৃদ্ধা অসহায় নারীদের নিয়ে কাজ করি। আমাদের কাছে অনেক অসহায় নির্যাতিত মা রয়েছে। যাদের সংসারে ঠাই নেই। সন্তান জন্ম দিয়েছে, বড় করেছে। এখন সেই সংসারে মায়ের জয়গা নেই। পরনের কাপড় ও পেটের খাবারের জন্য তারা আমাদের এখানে আছে। মানুষের মা মরে একবার। আর আমাদের মা মরে বারবার। অনেক মা এখানে মারা গেছেন। মানুষের সহযোগিতা বৃদ্ধাশ্রম চলে। রমজানে তাদের জন্য ইফতার সামগ্রী কিনতে পারি না। আজ ভাত খেয়ে ইফতার করেছে। অর্থের অভাবে মাদের চিকিৎসা করাতে পারিনা, যথাযথ খাওয়াতে পারিনা, থাকার কষ্ট রয়েছে। সরকার ও বিত্তবানদের কাছে সহযোগিতা চাই।

প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ইফতেখার হোসেন মিঠু বলেন, প্রায় দুই যুগ আগে আমার মায়ের মৃত্যু হয়। মায়ের মৃত্যুর পরে মায়ের জয়গাটা পূরণ করার জন্য কয়েকজন বৃদ্ধা মায়েদের নিয়ে উদয় মা ও শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু। আমরা অনেক কষ্ট করে এই প্রতিষ্ঠানটি চালাচ্ছি। রিজিকের ব্যবস্থা আল্লাহ করে দিচ্ছেন। কিন্তু আমাদের খুব কষ্ট হচ্ছে। রমজানে বৃদ্ধাশ্রমের মায়েরা রোজা রাখেন। অর্থের অভাবে তাদের ইফতার সামগ্রী ও সেহরিতে প্রয়োজনীয় খাবার ঠিকমতো কিনতে পারি না৷ ভাড়া বাসায় মায়েরা থাকে। বৃষ্টি হলে টিনের ফুটো দিয়ে ঘরের মধ্যে পানি চলে আসে, বিছানাপত্র ভিজে যায়। অর্থের অভাবে মায়েদের অনেক কষ্ট হয়। সরকার ও বিত্তবানদের কাছে সহযোগিতার আবেদন জানাচ্ছি।

মন্তব্য (0)

কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করুন

মন্তব্যটি অনুমোদনের পর প্রকাশিত হবে।